
আলোকিত নিউজ ডেস্কঃ
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, শিক্ষকতা, প্রশাসনিক দায়িত্ব, তৃণমূলের রাজনীতি ও জাতীয় নেতৃত্বের নানা বাঁক পেরিয়ে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৩৪৯ ভোটের মধ্যে ৩৪৩টি ভোট পড়ে। এর মধ্যে ২৫৫ ভোট পেয়ে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচিত হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট।
৭৮ বছর বয়সি মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হলো তার দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল রাজনৈতিক অভিযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৯১ সালের পর এবারই প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো।
গতকাল জাতীয় সংসদে ভোটের মাধ্যমে ২৫৫ ভোট পেয়ে তিনি বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন। তৃণমূলের পৌর চেয়ারম্যান থেকে সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, বিএনপির মহাসচিব এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ— মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই দীর্ঘ পথচলা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক অভিযাত্রার সাক্ষ্য হয়ে থাকল।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় মির্জা ফখরুলকে অলি আহমদের অভিনন্দন : রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অন্তত দীর্ঘদিনের একটি সীমাবদ্ধতা থেকে দেশকে বের করে এনেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর বিকেল ৫টার দিকে রাজধানীর মহাখালী ডিওএইচএসে নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের কাছে প্রতিক্রিয়া জানান অলি আহমদ। অলি আহমদ বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার সুস্বাস্থ্য ও সাফল্য কামনা করি।’ তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় আমরা উভয়ে একসঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি। সুতরাং গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, নাগরিক অধিকার ও জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে আমাদের বিশ্বাস ও অঙ্গীকার অভিন্ন।’
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রসঙ্গে অলি আহমদ বলেন, ‘বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দীর্ঘদিন প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন থেকেছে। ফলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই পদে বিকল্প নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি জাতীয় সংসদ ও জনগণের সামনে বিবেচিত হওয়ার সুযোগ ছিল না। ৩৫ বছর পর এবারের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অন্তত সেই সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে এসেছে।’ তিনি আশা প্রকাশ করেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখবেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের সমর্থনে প্রার্থী হয়েছিলেন কর্নেল ড. অলি আহমদ বীর বিক্রম (অব.)। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর নতুন রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানিয়ে এ প্রতিক্রিয়া জানান তিনি। নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। আর অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলকে চীনের অভিনন্দন : বাংলাদেশের নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন জানিয়েছে চীন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে দেশটি।
গতকাল বৃহস্পতিবার চীনের পক্ষ থেকে দেয়া এক অভিনন্দন বার্তায় বলা হয়, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আন্তরিক অভিনন্দন।’ বার্তায় আরও বলা হয়, চীন বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। নতুন যুগে দুই দেশের অভিন্ন ভবিষ্যৎ নির্মাণে বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে প্রস্তুত রয়েছে বেইজিং। চীন আশা প্রকাশ করেছে, পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশ ও দুই দেশের জনগণের জন্য আরও বেশি কল্যাণ বয়ে আনা সম্ভব হবে। সংসদ সদস্যদের ভোটে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
শপথ পাঠ করাবেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল : দেশের প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় দেশের নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ঐতিহাসিক বঙ্গভবনের দরবার হলে আয়োজিত এক জমকালো ও গাম্ভীর্যপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নতুন রাষ্ট্রপতি শপথ গ্রহণ করবেন। তবে এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের আয়োজন ও প্রশাসনিক পদ্ধতির চেয়েও যা বেশি নজর কেড়েছিল, তা হলো শপথ বাক্য পাঠ করানোর প্রশাসনিক ও আইনি অভিভাবকত্ব সংক্রান্ত জটিলতা।
অবশেষে সব ধরনের সাংবিধানিক প্রশ্ন ও আইনি দ্ব্যর্থতার নিরসন ঘটিয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত এসেছে। নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ বাক্য পাঠ করাবেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার তথা বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের দায়িত্বে থাকা ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেয়া এক স্পষ্ট ও সুস্পষ্ট আইনি মতামতের পর এই সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ফলে রাষ্ট্রপ্রধানের শপথ গ্রহণ নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে চলা ও আইনি অঙ্গনে যে চর্চা চলছিল, তার অবসান ঘটেছে।
সমপ্রতি দেশের সর্বোচ্চ শাসনতান্ত্রিক পদে আসীন হওয়ার প্রক্রিয়া এবং তৎকালীন স্পিকারের ভিন্ন একটি সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের কারণে রাষ্ট্রপতির শপথ পাঠ নিয়ে একটি বিশেষ আইনি পরিস্থিতি বা টেকনিক্যাল জটিলতার সৃষ্টি হয়। সংবিধান অনুযায়ী সাধারণত জাতীয় সংসদের স্পিকারই নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে শপথ বাক্য পাঠ করিয়ে থাকেন। কিন্তু দেশের বর্তমান প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ ঘটে। অনুচ্ছেদ ৫৪-এর বিধান সাপেক্ষে বর্তমান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়া কিংবা রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতি বা অন্য কোনো কারণে দায়িত্ব পালনে অসমর্থতার ক্ষেত্রে স্পিকারকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হয়।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন : মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও সাবেক সংসদ সদস্য। পারিবারিকভাবেই রাজনীতি ও জনসেবার আবহে বেড়ে ওঠেন ফখরুল। ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে তিনি ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্ররাজনীতি থেকে শিক্ষকতা : বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই তার রাজনৈতিক পথচলার সূচনা। ষাটের দশকে তিনি তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান স্টুডেন্টস ইউনিয়নের রাজনীতিতে যুক্ত হন। সংগঠনটির ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এবং এসএম হল ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের নেতৃত্বে ছিলেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সে সময় তাকে গ্রেপ্তার ও কারাবরণও করতে হয়।
স্বাধীনতার পর সক্রিয় দলীয় রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে তিনি পেশাজীবনে মনোনিবেশ করেন। ১৯৭২ সালে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের সদস্য হিসেবে ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। একই সময়ে সরকারি পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনেও দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি পূর্ণাঙ্গভাবে রাজনীতিতে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন।
রাজনীতিতে তার উত্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল ঠাকুরগাঁও পৌরসভা। ১৯৮৮ সালে নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তাকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়।
১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও জয় পাননি। অবশেষে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে একই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে তিনি কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে : দলের সাংগঠনিক রাজনীতিতেও ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে আসেন ফখরুল। ২০০৯ সালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন। ২০১১ সালে খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন। এক দশকেরও বেশি সময় তিনি দলটির অন্যতম প্রধান মুখ ও সাংগঠনিক নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি বিএনপির নেতৃত্বে সক্রিয় ছিলেন। কারাবরণ ও একাধিক মামলাসহ নানা রাজনৈতিক চাপের মুখোমুখি হওয়ার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
রাষ্ট্রপতি ভবনে নতুন অধ্যায় : ২০২৬ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে মির্জা ফখরুল স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এরপর ১৩ আগস্ট বিএনপি তাকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী ঘোষণা করে। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার পর তিনি বিএনপির মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেন।
গতকাল জাতীয় সংসদে ভোটের মাধ্যমে ২৫৫ ভোট পেয়ে তিনি বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন। তৃণমূলের পৌর চেয়ারম্যান থেকে সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, বিএনপির মহাসচিব এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ— মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই দীর্ঘ পথচলা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক অভিযাত্রার সাক্ষ্য হয়ে থাকল।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় মির্জা ফখরুলকে অলি আহমদের অভিনন্দন : রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অন্তত দীর্ঘদিনের একটি সীমাবদ্ধতা থেকে দেশকে বের করে এনেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর বিকেল ৫টার দিকে রাজধানীর মহাখালী ডিওএইচএসে নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের কাছে প্রতিক্রিয়া জানান অলি আহমদ। অলি আহমদ বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার সুস্বাস্থ্য ও সাফল্য কামনা করি।’ তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় আমরা উভয়ে একসঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি। সুতরাং গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, নাগরিক অধিকার ও জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে আমাদের বিশ্বাস ও অঙ্গীকার অভিন্ন।’
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রসঙ্গে অলি আহমদ বলেন, ‘বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দীর্ঘদিন প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন থেকেছে। ফলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই পদে বিকল্প নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি জাতীয় সংসদ ও জনগণের সামনে বিবেচিত হওয়ার সুযোগ ছিল না। ৩৫ বছর পর এবারের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অন্তত সেই সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে এসেছে।’ তিনি আশা প্রকাশ করেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখবেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের সমর্থনে প্রার্থী হয়েছিলেন কর্নেল ড. অলি আহমদ বীর বিক্রম (অব.)। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর নতুন রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানিয়ে এ প্রতিক্রিয়া জানান তিনি। নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। আর অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলকে চীনের অভিনন্দন : বাংলাদেশের নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন জানিয়েছে চীন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে দেশটি।
গতকাল বৃহস্পতিবার চীনের পক্ষ থেকে দেয়া এক অভিনন্দন বার্তায় বলা হয়, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আন্তরিক অভিনন্দন।’ বার্তায় আরও বলা হয়, চীন বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। নতুন যুগে দুই দেশের অভিন্ন ভবিষ্যৎ নির্মাণে বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে প্রস্তুত রয়েছে বেইজিং। চীন আশা প্রকাশ করেছে, পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশ ও দুই দেশের জনগণের জন্য আরও বেশি কল্যাণ বয়ে আনা সম্ভব হবে। সংসদ সদস্যদের ভোটে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
শপথ পাঠ করাবেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল : দেশের প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় দেশের নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ঐতিহাসিক বঙ্গভবনের দরবার হলে আয়োজিত এক জমকালো ও গাম্ভীর্যপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নতুন রাষ্ট্রপতি শপথ গ্রহণ করবেন। তবে এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের আয়োজন ও প্রশাসনিক পদ্ধতির চেয়েও যা বেশি নজর কেড়েছিল, তা হলো শপথ বাক্য পাঠ করানোর প্রশাসনিক ও আইনি অভিভাবকত্ব সংক্রান্ত জটিলতা।
অবশেষে সব ধরনের সাংবিধানিক প্রশ্ন ও আইনি দ্ব্যর্থতার নিরসন ঘটিয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত এসেছে। নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ বাক্য পাঠ করাবেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার তথা বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের দায়িত্বে থাকা ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেয়া এক স্পষ্ট ও সুস্পষ্ট আইনি মতামতের পর এই সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ফলে রাষ্ট্রপ্রধানের শপথ গ্রহণ নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে চলা ও আইনি অঙ্গনে যে চর্চা চলছিল, তার অবসান ঘটেছে।
সমপ্রতি দেশের সর্বোচ্চ শাসনতান্ত্রিক পদে আসীন হওয়ার প্রক্রিয়া এবং তৎকালীন স্পিকারের ভিন্ন একটি সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের কারণে রাষ্ট্রপতির শপথ পাঠ নিয়ে একটি বিশেষ আইনি পরিস্থিতি বা টেকনিক্যাল জটিলতার সৃষ্টি হয়। সংবিধান অনুযায়ী সাধারণত জাতীয় সংসদের স্পিকারই নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে শপথ বাক্য পাঠ করিয়ে থাকেন। কিন্তু দেশের বর্তমান প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ ঘটে। অনুচ্ছেদ ৫৪-এর বিধান সাপেক্ষে বর্তমান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়া কিংবা রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতি বা অন্য কোনো কারণে দায়িত্ব পালনে অসমর্থতার ক্ষেত্রে স্পিকারকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হয়।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করায় প্রশ্ন ওঠে, রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণের সময় শপথ পাঠ করানোর চূড়ান্ত সাংবিধানিক ক্ষমতা কার ওপর বর্তাবে? একজন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি কি নতুন রাষ্ট্রপতিকে শপথ পাঠ করাতে পারেন, নাকি এতে সাংবিধানিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব বা আইনের অসঙ্গতি দেখা দেবে- এমন নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল। এই জটিল নিরসনে চূড়ান্ত ও আইনি ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে আইন মন্ত্রণালয়ে লিখিত মতামত চাওয়া হয়।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আবেদনের প্রেক্ষিতে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সমগ্র সংবিধান, পূর্ববর্তী দৃষ্টান্ত এবং আইনি ধারা পর্যালোচনা করে একটি বিশদ বিজ্ঞপ্তি ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা জারি করে। আইন মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় যে, ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের নতুন রাষ্ট্রপতিকে শপথ পাঠ করানোর ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সাংবিধানিক বা আইনি বাধা নেই। মন্ত্রণালয় তাদের আইনি পর্যালোচনায় সংবিধানের প্রধান দুই অনুচ্ছেদ- অনুচ্ছেদ ৫৪ এবং অনুচ্ছেদ ৭৪(৩)-এর পারস্পরিক সম্পর্ককে মূল ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে। আইন মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা অনুসারে—
১. সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ, এই অনুচ্ছেদের অধীনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন। রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালনকালে তিনি স্বাভাবিকভাবেই স্পিকারের দৈনিক ও প্রশাসনিক কার্যাবলি থেকে বিরত থাকেন।
২. সংবিধানের ৭৪(৩) অনুচ্ছেদ, সংবিধানের এই অনুচ্ছেদের স্পষ্ট বিধান ও বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী, স্পিকারের অনুপস্থিতিতে বা স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালে স্পিকারের যাবতীয় দায়িত্ব ও ক্ষমতা ডেপুটি স্পিকারের ওপর অর্পিত হয়। অতএব, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল কেবল ডেপুটি স্পিকার হিসেবেই নন, বরং স্পিকারের অর্পিত সকল পূর্ণ আইনি ও সাংবিধানিক ক্ষমতার অধিকারী ‘ভারপ্রাপ্ত স্পিকার’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আইন মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনায় স্পষ্ট বলা হয়, এই পরিস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার হিসেবে ব্যারিস্টার কায়সার কামালই নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে শপথ বাক্য পাঠ করানোর ক্ষেত্রে একক ও যথাযথ সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ।
আইন মন্ত্রণালয়ের এই আইনি মতামত পাওয়ার পরপরই শপথ গ্রহণের প্রস্তুতি দ্রুততার সঙ্গে চূড়ান্ত করছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। রাষ্ট্রপতি কার্যালয় ও বঙ্গভবন সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় নির্ধারিত সময়েই বঙ্গভবনে রাষ্ট্রীয় আচার ও প্রটোকল মেনে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানে সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তা, সুপ্রিম কোর্টের বিচারকবৃন্দ, বিদেশি কূটনীতিক এবং সামরিক ও বেসামরিক উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে। ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল নতুন রাষ্ট্রপতিকে দেশের সংবিধান সংরক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানের শপথ পাঠ করাবেন। শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেবেন দেশের নতুন রাষ্ট্রপ্রধান।
আইন বিশেষজ্ঞ ও সংবিধান প্রণেতাদের মতে, আইন মন্ত্রণালয়ের এই সময়োপযোগী ও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যার ফলে একটি জটিল সাংবিধানিক পরিস্থিতির অত্যন্ত সুসংহত ও আইনানুগ সমাধান হলো, যা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও শাসনতান্ত্রিক ধারাবাহিকতাকে আরও সুদৃঢ় করবে।