
শরীফ ফায়েজুল কবীর,মাদারীপুর প্রতিনিধিঃ
মাদারীপুরে অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে নদীর তীরবর্তী তলদেশ থেকে বালু ও মাটি কেটে লুট করায় প্রায় অর্ধশত পরিবার তাদের ভিটেমাটি, বাড়িঘর ও ফসলি জমি হারিয়ে এখন নিঃস্ব প্রায়। অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে রাতের আধারে বালু ও মাটি কেটে নেয়া হচ্ছে- এমন তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার (৬, আগষ্ট) দুপুরে মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়নের হোগলপাতিয়া ও চরহোগলপাতিয়ার আড়িয়ালখাঁ নদীর তীরবর্তী দুর্গম এলাকায় সরেজমিনে পরিদর্শন ও তথ্য সংগ্রহকালে এমন দৃশ্য বাস্তবে দেখা গেছে। সেখানকার ভূক্তভোগী অনেকগুলো পরিবার জানান, বছরের বেশীরভাগ সময় রাত ৮ টা থেকে সকাল ৬ টা পর্যন্ত দুই-তিনটি ইঞ্জিনচালিত ড্রেজার লাগিয়ে বালু-মাটি কেটে নিচ্ছে প্রভাবশালী মহল। প্রশাসন ও মানুষের চোখে ধোঁকা দিতে দিনের বেলায় উক্ত ড্রেজার মেশিন ও বালুমাটি টানা বোটগুলো অন্যত্র সরিয়ে রাখা হয়। কে বা কারা এগুলো কেটে নিচ্ছে- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে সেখানকার ভূক্তভোগীরা বলেন, “আমাদের ঘাড়ে কয়টি মাথা যে, আমরা ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী এসব অবৈধ ড্রেজার মালিকদের নাম বলে দিয়ে স্ত্রী-সন্তান ও পরিবার নিয়ে এখানে বসবাস করতে পারবো ? বরং নাম বলে দিলে আমাদের জীবনটা পর্যন্ত চলে যেতে পারে, আমাদের মেরে ফেলতে পারে”।
তারা আরও বলেন, প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয় দুই-তিনটি ড্রেজার দিয়ে মাটি ও বালু কাটার কাজ এবং সেগুলো রাতের আঁধারেই ২৫/৩০ টি ছোট-বড় ইঞ্জিনচালিত ট্রলার দিয়ে মাদারীপুর সদর সহ বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে গিয়ে বিক্রি করা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন জানান, চরহোগলপাতিয়ার চৌকিদার মাসুদ হাওলাদার, তার ভাই তৈয়ব হাওলাদার সহ পার্শ্ববর্তী মুজাম সরদার ও তাদের সাঙ্গ-পাঙ্গদের নেতৃত্বে এই ড্রেজার পরিচালিত হয়, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেই পাওয়া যাবে ড্রেজারমালিক গডফাদারদের পরিচয়। ইতিমধ্যে অনেকের ঘরবাড়ি বহুবার ভাঙ্গণের মুখে পড়া সহ ফসলি জমি, কলাবাগান, আপেলকূল বাগান, সব্জির বাগান সহ দামী সব গাছপালা নদীগর্ভে চলে গেছে। ভিটামাটি হারিয়ে অনেকে অন্যত্র বাড়ীঘর বানিয়ে বসবাস করছেন। ভূক্তভোগীদের মধ্যে আঃ ছোবহান তালুকদার, ইউনুছ হাওলাদার , কুতুব আকন, এনামুল আকন, মোসলেম হাওলাদর, শহীদুল আকন সহ অন্যান্যরা জানান, এর আগেও তারা বিষয়টি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সহ প্রশাসনকে জানিয়েছে কিন্তু প্রতিকার পায়নি। তারা আরও বলেন, অবৈধ এসব ড্রেজার কার্যক্রম বন্ধ না হলে যে কোনো সময় তাদের বর্তমান বাড়ীঘর সহ বাকী জমিজমাগুলোও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।
এহেন অবস্থার প্রেক্ষিতে মাদারীপুর জেলা প্রশাসক মিজ্ মর্জিনা আক্তারের কাছে একাধিক সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তিনি জানান, “বিষয়টি তাদের নজরেও এসেছে, ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলো থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং এতদসংক্রান্ত মানবিক এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির ব্যাপারে আইননানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে”। তিনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি সহ সর্বস্তরের নেতৃবৃন্দ ও সচেতন মহলকে তাকে সহযোগিতার অনুরোধ জানান। মাদারীপুর জেলা বিএনপি’র যুগ্ম- আহবায়ক মিজানুর রহমান মুরাদ অবৈধ ড্রেজার ব্যবসায়ী সম্পর্কে সরাসরি এক ভিডিও সাক্ষাতকারে বলেন, ‘শত-শত পরিবার তাদের ভিটেমাটি হারিয়ে আজ নিঃস্ব। তিনি আরো বলেন, অবৈধ ড্রেজার ব্যবসায়ীদের বালু ও মাটি কেটে নেয়ার কারণে মাদারীপুর শহরও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, তাদের কাছ থেকে থেকে কাঁচা টাকা পেয়ে সমাজে বাড়ছে মাদকসেবী, কিশোরগ্যাং ও অপরাধীর সংখ্যা এবং এই নিয়ে কোন্দলে ইতিমধ্যে ৫/৬ জন মানুষও খুন হয়েছে, যা ধামচাপা পড়ে যাচ্ছে। তিনি এসব অবৈধ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য মাদারীপুর প্রশাসনকে আহবান জানিয়েছেন।