
বিশেষ প্রতিনিধিঃ
সিপাহি-জনতা ভাই ভাই, জিয়ার মুক্তি চাই’, ‘সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ, জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ’, ‘সৈনিক সৈনিক ভাই ভাই, অফিসারদের রক্ত চাই’ এমন নানা স্লোগানে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর উত্তাল হয়ে উঠেছিল ঢাকার রাজপথ ও সেনানিবাস। ব্যারাক ছেড়ে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন সাধারণ সৈনিকেরা। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন সাধারণ মানুষও। স্লোগানে স্লোগানে ছড়িয়ে পড়ে বিদ্রোহের বার্তা। একপর্যায়ে গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত করা হয় তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানকে। সেদিনের স্লোগানগুলো শুধু ক্ষোভ কিংবা মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ছিল না, বরং দেশের তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির গভীর সংকটও তুলে ধরেছিল।
৬ নভেম্বর দিবাগত রাত থেকে ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে ঢাকা সেনানিবাসে সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে বিদ্রোহ শুরু হয়। ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’ এবং ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই, জিয়াউর রহমানের মুক্তি চাই’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে সেনানিবাস। বিদ্রোহের খবর দ্রুত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষও রাজপথে নেমে আসেন। সৈনিক ও জনতার মধ্যে গড়ে ওঠে সংহতি। ট্যাংকের ওপর উঠে জাতীয় পতাকা ওড়ানোর পাশাপাশি তারা আধিপত্যবাদবিরোধী নানা স্লোগান দিতে থাকেন।
‘সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ, জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিতে দিতে বিদ্রোহী সৈনিকেরা জিয়াউর রহমানের বাসভবনের দিকে এগিয়ে যান। সেখানে পৌঁছে তারা তাকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করেন। এ সময় সেনানিবাস ও রাজপথজুড়ে প্রতিধ্বনিত হয় ‘সিপাহি-সিপাহি ভাই ভাই’ এবং ‘জেনারেল জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ’ স্লোগান।
সাধারণ মানুষের কণ্ঠেও তখন একই দাবি উচ্চারিত হচ্ছিল ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই, জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ’। সেদিনের স্লোগানে একদিকে জিয়াউর রহমানের মুক্তির দাবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, অন্যদিকে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ এবং তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়াও প্রকাশ পায়।
মুক্তির পর ৮ নভেম্বর থেকে জিয়াউর রহমান সেনানিবাসে সৈনিকদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় শুরু করেন। বিভিন্ন সমাবেশে তিনি সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন। ওই দিন বিকেলে ঢাকা সেনানিবাসের চতুর্থ বেঙ্গলের লাইনের কাছে সৈনিকদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন তিনি।
সে সময় সেনানিবাসের অধিকাংশ সৈনিকের হাতেই অস্ত্র ছিল। জিয়াউর রহমান দৃঢ়কণ্ঠে তাদের অস্ত্র জমা দিয়ে নিজ নিজ ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে সৈনিকদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া পূরণের আশ্বাসও দেন।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে স্লোগান হয়ে উঠেছিল বিদ্রোহের ভাষা, সংহতির প্রকাশ এবং রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিচ্ছবি। ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’ থেকে ‘জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ’ প্রতিটি স্লোগানেই ফুটে উঠেছিল তৎকালীন অস্থিরতা, মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও ক্ষমতার পালাবদলের চিত্র। এ কারণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দিনটি ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।