
বিশেষ প্রতিনিধিঃ
এগুলো ভাঙাড়ি নয়, মামলার আলামত। প্রতিটি আলামতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোনো মানুষের সঞ্চয়, একটি পরিবারের জীবিকা কিংবা রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকার সম্পদ। অথচ মামলার তদন্তের প্রয়োজনে জব্দ করা এসব যানবাহনের অনেকগুলোই বছরের পর বছর পড়ে থেকে জং ধরছে, ভেঙে যাচ্ছে কিংবা হারিয়ে যাচ্ছে যন্ত্রাংশ।
মামলা নিষ্পত্তির আগেই মূল্যবান এসব আলামত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে সম্পদের এই ক্ষতির দায় কার। বিষয়টি গড়িয়েছে উচ্চ আদালত পর্যন্ত। আদালতের নির্দেশে প্রতিবেদন দেওয়ার পর পুলিশের অনুসন্ধানে আলামত সংরক্ষণে অব্যবস্থাপনার চিত্র উঠে এসেছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জব্দকৃত যানবাহনের সংখ্যা ৩৫ হাজারের বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার গাড়ি ১০ বছরের বেশি সময় ধরে ডাম্পিং জোনে পড়ে আছে। অন্যান্য মূল্যবান আলামতের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। এক দশক ধরে জব্দ থাকা মালামালের একটি বড় অংশ মালখানায় পড়ে রয়েছে।
রিটকারী আইনজীবী শিশির মনির বলেন, দীর্ঘদিন ধরে যানবাহনগুলো পড়ে থাকতে থাকতে জং ধরে যাচ্ছে, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে এটি না ক্রেতার কাজে আসছে, না বিক্রেতার কাজে আসছে, এমনকি সরকারেরও কোনো কাজে আসছে না।
পুলিশের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জায়গা সংকটের পাশাপাশি সারা দেশে থাকা ৯৬৭টি মালখানার মধ্যে ১২২টি ব্যবহারের অনুপযোগী। আরও বড় সমস্যা হলো, আলামত সংরক্ষণের জন্য সরকারিভাবে অনুমোদিত কোনো ডাম্পিং ইয়ার্ড নেই। ফলে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকছে মামলার আলামত।
পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া অ্যান্ড পিআর বিভাগের এআইজি এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, এর কারণ হচ্ছে, যখন কোনো মামলা হয়, তখন তদন্তের যেসব আলামত থাকে, সেগুলো তদন্তের স্বার্থে সংরক্ষণ করা হয় এবং ভবিষ্যতে প্রমাণের সাপেক্ষে আদালতের নির্দেশে সেগুলো ডিসপোজাল দেয়া হয়। এখন আদালতের ডিসপোজাল ছাড়া পুলিশ নিজ দায়িত্বে এসব জিনিস ডিসপোজাল দেওয়ার সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে পুলিশের একটি আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকা এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা যথাসময়ে সংশ্লিষ্ট থানায় না পৌঁছানোর কারণে ক্রমেই বাড়ছে আলামতের সংখ্যা। এ পরিস্থিতিতে বিকল্প ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিশির মনির বলেন, একটি থানার সামনে একটি বাস রেখে দিচ্ছেন কেন? মোটরসাইকেলের কি বিচার করবেন? আপনি কি টেম্পুর বিচার করবেন? টেম্পুর তো বিচার হয় না। তাহলে আপনি আদালতে কী ব্যবহার করবেন? আপনি ৩৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে ছবি তুলতে পারেন এবং সেই ছবিকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। একইভাবে ভিডিও ক্লিপও ব্যবহার করতে পারেন। বর্তমান এভিডেন্স সেক্টরের সব ধরনের বিধানই এখন চলে আসছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি নির্দিষ্ট ডাম্পিং ইয়ার্ড স্থাপন, আলামতের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত অডিট এবং আদালত ও পুলিশের মধ্যে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা করা জরুরি।