
সম্পাদকীয়ঃ
গত শনিবার রাতে রংপুর শহরের কামালকাছনা এলাকার তিনতলা একটা বাড়ি থেকে একই পরিবারের চারটি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা লাশ চারটি হলো রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী,মেয়ে ও ছেলের। প্রথমে এই চার হত্যাকা-ের নেপথ্য কারণ হিসাবে ডাকাতি ধারণা করা হলেও রোববার সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশ জানিয়েছে, ইয়াবা সেবনে বাধা দেয়ায় তাদের হত্যা করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে এলাকার দুই তরুণকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করেছে, ইয়াবা সেবনে বাধা দান করার জন্য তারা তাদের হত্যা করেছে। তারা আরো বলেছেন, হত্যাকা-ের পর তারা ওই বাড়িতেই গোসল করে শসা ও খেজুর খায়। এরপর কাছে থাকা ইয়াবা সেবন করে। রাত্রী যাপন শেষে তারা পরদিন দুপুরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। গ্রেফতারকৃত দুই তরুণ হলো শহরের কোতয়ালি থানার ২৪ নং ওয়ার্ডের মাছুয়াপাড়া এলাকার কানু দাসের ছেলে মুগ্ধ দাস ও বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস। এই চার হত্যাকা-ের ঘটনা এলাকায় ব্যাপক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও শোকের ছায়া বিস্তার করেছে। এলাকাবাসী মানববন্ধন করে হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে। যে কোনো হত্যাকা-ই দুঃখজনক। যদি সে হত্যাকা-ের শিকার হয় একটি পরিবার, তা হলে তা আরো বেশি দুঃখজনক। গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের সদস্যরা অত্যন্ত ভদ্র হিসাবে পরিচিত ছিলেন। শোকের মাত্রাটা তাই আরো বেশি। অতি সাধারণ মানুষও যে এখন মোটেই নিরাপদ নয়, এ হত্যাকা-ের ঘটনা তার প্রমাণ বহন করে। বলাবাহুল্য এক বা একাধিক, এমন কি পরিবারশুদ্ধ হত্যাকা-ের শিকার হওয়ার ঘটনা এখন হরহামেশাই ঘটছে। যে দিন রংপুর শহরে চার হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটে, তার পরদিন বাগেরহাট, ফরিদপুর, ঈশ্বরদী, জামালপুর ও ঝিনাইদহে পাঁচজনের নিহত হওয়ার ঘটনা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। বলতে গেলে এমন কোনো দিন নেই, যেদিন দেশের কোথাও না কোথাও হত্যাকা-ের ঘটনা না ঘটছে। রাজধানী থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, খুলনা প্রভৃতি মহানগরীসহ বিভিন্ন শহর ও গ্রামে-গঞ্জে হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরসহ বেশ কয়েকটি এলাকা হত্যাকা-ছিনতাই, রাজহানি ইত্যাদির অভয়ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে গত মে পর্যন্ত নগরে অন্তত ১২৫টি খুনের মামলা হয়েছে। চলতি বছরের ৭ মাসেই খুন হয়েছে অন্তত ২৫ জন। জেলার রাউজান উপজেলার চিত্র আরো উদ্বেগজনক। গত ১৩ মাসে ২৮টি হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ১৮ জনই বিএনপির নেতাকর্মী। খুলনা মহানগরীতে প্রায় প্রতি মাসেই হত্যাকা-ের শিকার হচ্ছে মানুষ। গত ২০ মাসে এখানে অন্তত ৬১ জন নিহত হয়েছে। পুলিশ সদর দফতরের হিসাবে ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই এই ৬ মাসে সারাদেশে হত্যা মামলা হয়েছে ১৭৮২টি। আগের বছর একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১৫৮৫টি।
শুধু হত্যাকা-ই নয়, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, আত্মহত্যা ইত্যাদি এমনভাবে বেড়েছে যে, পরিবার ও সামাজিক পর্যায়ে উদ্বেগ-শংকার কোনো শেষ নেই। আইনশৃঙ্খলার এহেন অবনতি কোনো বিবেচনাতেই বরদাশতযোগ্য হতে পারে না। মাদক অপ্রতিরোধ্য। সীমান্ত পেরিয়ে ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকসামগ্রী দেশে অনুপ্রবেশ করছে। মাদক নিয়ে, তার ব্যবসায়ে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে লাগাতার খুন-জখমের ঘটনা ঘটছে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা মাদকসংঘসহ এমন কোনো অপরাধ নেই, যার সঙ্গে জড়িত নয়। এরা দেশ ও সমাজে বড় রকমের উৎপাতের কারণে পরিণত হয়েছে। খবর বেরিয়েছে, ভারত থেকে মাদক ও অস্ত্র অবাধে অনুপ্রবেশ করছে, যা একই সঙ্গে সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাহুমকি হিসাবে ভূমিকা রাখছে। কিছুদিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বোমা বা বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে। এদিকে গতকালই পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, চীনসহ বন্ধুপ্রতীম ৩-৪টি দূতাবাসে ই-মেইলে হামলার হুমকি দিয়েছে একটি দুর্বৃত্তগোষ্ঠী। তারা হামলার হুমকি দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, চাঁদাও দাবি করেছে। এসব আলামত মোটেই সুবিধাজনক বলে মনে হচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা সম্পূর্ণ অকেজো করে দেয়ার একটি দুরভিসন্ধি এর পেছনে রয়েছে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে। বলা জরুরি, পতিত ও বিতাড়িত ফ্যাসিস্টরা পরিকল্পিতভাবে দেশকে অরাজক পরিস্থিতির দিকে নিক্ষেপ করার মাধ্যমে বর্তমান সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করার চেষ্টা করছে শুরু থেকেই। ফ্যাসিস্টবান্ধব ভারত সরকার তাদের সর্বতোভাবে সহযোগিতা করছে। বাংলাদেশকে নানাভাবে হুমকি-ধমকি দিতেও ভারত এতটুকু কসুর করছে না। পরিকল্পিত কর্মকা-ের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং নাগরিকনিরাপত্তা ব্যাহত করা যে কোনো দেশকে অকার্যকর ও সরকারকে ব্যর্থ করে দেয়ার মোক্ষম উপায় হিসাবে পরিগণিত হয়ে থাকে। অতএব, এখনই সতর্ক হওয়ার বিকল্প নেই।
দেশের অর্থনীতির অবস্থা মোটেই ভালো নেই। দু’য়েকটি বাদে অর্থনীতির এমন কোনো সূচক নেই, যা ইতিবাচক। জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট অর্থনীতিতে এমন জোর ধাক্কা দিয়েছে যে, সে ধাক্কা সামলে ওঠা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবাসিক থেকে শুরু করে শিল্পকারখানায় গ্যাস সংকট প্রকট। বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনেও গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ। চুলা জ্বলছে না। উৎপাদন বড় আকারে ব্যাহত হচ্ছে। উদ্যোক্তা ও শিল্পমালিকরা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহ দাবি করছে। ইতোমধ্যে গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে শতশত কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। লাখ-লাখ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছে। প্রধান রফতানি খাত গার্মেন্টসের অবস্থা নাজুক। ক্রয়াদেশ কমছে। রফতানি কমছে। চাহিদা অনুযায়ী পণ্যাদি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। সরকার বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু জ্বালানি গ্যাস, বিদ্যুৎ সরবরাহের নিশ্চয়তা ছাড়া এ চেষ্টার সফলতা আশা করা যায় না। অর্থনীতিতে তেজীভাব আনা এ মুহূর্তে সরকারের জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। অথচ, সরকার বাস্তব-অবাস্তব বিবিধ কারণে সেটা করতে অপারগ। ওদিকে গণমানুষের অর্থনীতি সঙ্গতকারণেই অত্যন্ত শোচনীয় দশায় পড়েছে। পণ্যমূল্যে লাগাম টানা যাচ্ছে না। নিত্যপণ্যের দাম প্রতিদিনই বাড়ছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, সার ইত্যাদির জন্য মানুষ হাহাকার করে মরছে। এমতপরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা যদি ভেঙ্গে পড়ে, নাগরিকনিরাপত্তা প্রান্তিক অবস্থায় উপনীত হয়, তাহলে গণমানুষ দাঁড়াবে কোথায়? অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারকে সফল হতে হলে এ দুই চ্যালেঞ্জে বিজয়ী হতে হবে। এখানে হারার বা ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কীভাবে অর্থনীতির সংকট মোকাবিলা করা যায়, কীভাবে আইনশৃঙ্খলা ও নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, তা সর্বোচ্চ বিবেচনায় আনতে হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা যে অগ্রাধিকার দাবি করে সে অনুযায়ী পুলিশকে সক্রিয়, দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে।
মোঃ কামরুজ্জামান মিলন
সম্পাদক ও প্রকাশক
দৈনিক আলোকিত নিউজ
স্মার্ট টিভি
চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডাইরেক্টর
ঢাকা।