
নাহিদ ইসলাম, রাজশাহী ব্যুরো:
তীব্র শীত যখন নিম্নআয়ের ও ভাসমান মানুষের জীবনে নীরব দুর্ভোগ ডেকে আনে, ঠিক তখনই মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) বগুড়া জেলা কার্যালয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ৩৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শনিবার (৩ জানুয়ারি) রাতে ডিএনসি বগুড়া জেলার উপপরিচালক জিললুর রহমানের নেতৃত্বে জেলা কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সরকারি কোনো বরাদ্দ নয়, নিজ অর্থায়নে শীতার্ত, অসহায় ও ছিন্নমূল মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করেছেন।
রাতের হাড় কাঁপানো শীত উপেক্ষা করে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে—রেলস্টেশন, বকশিবাজার, সাতমাথা,
রেলগেট ও জেলখানার মোড়ে বিভিন্ন শ্রেনীর মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এই সহায়তা। যাদের অনেকেরই মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, নেই শীত মোকাবেলার সামান্য প্রস্তুতিও—তাদের হাতেই তুলে দেওয়া হয় উষ্ণ কম্বল ও শীতবস্ত্র।
শীতবস্ত্র পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অনেক অসহায় মানুষ। কেউ বলেন, “অনেকেই আসে, ছবি তোলে, কিন্তু কম্বল দেয় না। আজ সত্যিই শীত থেকে একটু বাঁচলাম।” কারও চোখে ছিল কৃতজ্ঞতার অশ্রু।
শীতবস্ত্র পেয়ে খুশি এক রিকশাচালক বলেন,
“সারা রাত রিকশা চালাই, আবার অনেক সময় রাস্তায়ই থাকতে হয়। এই শীতে কম্বল ছাড়া থাকা খুব কষ্টের। আজ ডিএনসি থেকে কম্বল পেয়ে সত্যিই অনেক উপকার হয়েছে। মনে হচ্ছে কেউ আমাদের কথা ভাবছে। আল্লাহ তাদের ভালো রাখুক।”
এই মানবিক কার্যক্রম প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডিএনসি বগুড়ার জেলার উপপরিচালক জিললুর রহমান বলেন,“রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতাও রয়েছে। শীতের রাতে রাস্তায় ঘুমানো মানুষগুলোর কষ্ট আমাদের নাড়া দিয়েছে। তাই সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করে নিজ উদ্যোগে ও নিজ অর্থায়নে এই শীতবস্ত্র বিতরণের সিদ্ধান্ত নিই। এটি কোনো প্রদর্শনী নয়, বরং একজন মানুষ হিসেবে আরেকজন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষুদ্র প্রয়াস।”
জিললুর রহমান বলেন,“আমরা মাদকবিরোধী দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রতিদিনই সমাজের বাস্তব চিত্র দেখি। শীত মৌসুমে রাস্তায় ঘুমিয়ে থাকা মানুষগুলোর জীবন খুবই কঠিন। অনেক সময় তারা এমন পরিস্থিতিতে থাকে, যেখানে শীত, ক্ষুধা আর নিরাপত্তাহীনতা একসঙ্গে তাদের উপর চাপ সৃষ্টি করে। আমরা চাই, কোনো মানুষ এই শীতের রাতে নিঃসাহায্য অবস্থায় না থাকুক।
“তিনি বলেন, এটি কোনো প্রচারণামূলক কার্যক্রম নয়। আমাদের উদ্দেশ্য শুধু মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের কষ্ট কিছুটা হলেও কমানো। প্রত্যেকটি কম্বল, প্রত্যেকটি শীতবস্ত্রের সঙ্গে আমরা এই বার্তাটি পৌঁছে দিতে চাই যে—সমাজের কোনো মানুষ একা নয়। আমরা চাই সমাজের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান এবং মানুষরাও এগিয়ে আসুক, যেখানে প্রয়োজন সেখানে সাহায্যের হাত বাড়াক।
আমাদের বিশ্বাস, আইন প্রয়োগের দায়িত্বের পাশাপাশি মানবিক দায়িত্ব পালন করা সমান গুরুত্বপূর্ণ। যদি আমরা একজন মানুষ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব বুঝি এবং প্রয়াস করি, তাহলে শীতের অন্ধকারও মানুষদের জন্য উষ্ণতা এবং আশার আলো হিসেবে বদলে যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ডিএনসি শুধু মাদকবিরোধী অভিযানেই সীমাবদ্ধ নয়; সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে ভবিষ্যতেও এ ধরনের মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার চেষ্টা থাকবে।
ডিএনসি বগুড়া জেলা কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানান, শীতবস্ত্র বিতরণের সময় কোনো আনুষ্ঠানিকতা রাখা হয়নি। নিরবে-নিভৃতে প্রকৃত অসহায়দের খুঁজে বের করে তাদের হাতে সহায়তা তুলে দেওয়াই ছিল মূল লক্ষ্য।
শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করা এক ব্যবসায়ী বলেন,“অনেক সময় দেখি বিভিন্ন সংগঠন আসে, ছবি তুলে চলে যায়। কিন্তু আজ রাতে ডিএনসি’র লোকজন সত্যিই অসহায় মানুষদের খুঁজে খুঁজে কম্বল দিলেন। এমন মানবিক কাজ খুব কম দেখা যায়।”
এক চা দোকানি বলেন,“ডিএনসি মানেই আমরা সাধারণত অভিযান আর গ্রেপ্তারের খবর শুনি। কিন্তু আজ তাদের এই মানবিক চেহারা দেখে ভালো লাগছে। এতে সাধারণ মানুষের কাছে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি বিশ্বাস বাড়ে।”
স্থানীয় সমাজকর্মী বলেন,“আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা যখন নিজ অর্থায়নে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান, তখন সেটি সমাজে বড় বার্তা দেয়। এটি শুধু শীতবস্ত্র বিতরণ নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার একটি উদ্যোগ।”
একজন পথচারী মন্তব্য করেন,“শীতের রাতে যারা রাস্তায় ঘুমায়, তাদের কষ্ট বোঝা খুব জরুরি। ডিএনসি বগুড়ার এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, মাদকবিরোধী কঠোর অভিযানের পাশাপাশি ডিএনসি বগুড়া জেলা কার্যালয়ের এমন মানবিক উদ্যোগ সংস্থাটির ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করেছে। এতে সমাজে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতি ইতিবাচক ধারণা তৈরি হবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।