
ষ্টাফ রিপোর্টারঃ
মাদারীপুরের শহরে উপকন্ঠে আড়িয়ালখাঁ ও কুমার নদীপাড়ের মাটি অবৈধভাবে কেটে অন্যত্র তা বিক্রি করে ফসলী জমির ক্ষতি করছেন স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল । আর তাতে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বিভিন্ন ফসল সহ নদীর তীরবর্তী সাধারণ কৃষকরা, ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন, ভাঙ্গণের ঝুঁকিতে রয়েছে নদীরপাড় ও বসতবাড়ী। প্রতিদিন রাতের আঁধারে ও ভোরে মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে ইটের ভাটা সহ মাটি ক্রেতাদের কাছে ও বিভিন্ন জায়গায়- এমন অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিনে সেখানে গিয়ে এর সত্যতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। শুধু ফসলী জমি-ই নয় এর সাথে ক্ষতি হচ্ছে কৃষকের ফসল, আর নদী ভাঙ্গণের ফলে নদীপাড়ের বাসিন্দারা রয়েছেন বসতবাড়ী হারাণোর ঝুঁকিতে। নদী খেকো প্রভাবশালীরা অন্য প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে দেদারছে মাটি বিক্রি করে হচ্ছেন লাখোপতি ও কোটিপতি। মাদারীপুর সদর উপজেলা পাঁচখোলা ইউনিয়নের উত্তর মহিষেরচর গ্রামের স্থানীয় আবু চৌকিদারের পুত্র মোঃ ইলিয়াস চৌকিদার উল্লেখিত নদী দু’টোর মাটি কাটা ও বিক্রির সাথে জড়িত।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, একাধিকবার বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনকে জানালেও কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি বা মাটি খেকো ইলিয়াস চৌকিদারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বরং বহাল তবিয়তে সে রাতের আঁধারে ও ভোর রাতের দিকে এবং সকাল ৭/৮ টার মধ্যে তার মাটি কাটা অব্যাহত রেখে চলেছে দিনের পর দিন এবং মাসের পর মাস। এলাকাবাসী প্রতিবাদ করলে মাঝে-মধ্যে সে তা সাময়িক বন্ধ রাখে কিন্তু কিছুদিন পর তা আবার পূর্বের মতো চলতে থাকে। তার প্রভাব-প্রতিপত্তির ভয়ে অমেকে ভীতসন্ত্রস্ত থাকেন। এ ব্যাপারে সরেজমিনে ও বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ-খবর নিয়ে জানা গেছে, ইলিয়াস চৌকিদার তার নিজস্ব লোকজন নিয়ে কখনো রাতের আঁধারে আবার কখনো ভোর থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত মাটি কেটে ট্রলারে করে নৌপথে সেই মাটি নিয়ে যাচ্ছেন অন্যত্র। প্রথমে তার নিজস্ব জমি থেকে মাটি কাটলেও পরবর্তীতে স্থানীয় খলিল চৌকিদার, বাবুল চৌকিদারের জমি থেকেও মাটি কাটা হয়েছে বলে ভুক্তভোগীরা জানায়। নদীর পাড়ে মাটি কাটার কারণে বড়-বড় গর্ত হয়ে গেছে। এর ফলে পাশে থাকা স্থানীয় কাদের সরদারের লাউগাছ , লাল শাক, টমেটো, করলাসহ তার সবজির ক্ষেত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। হুমকিতে রয়েছে মিন্টু সরদারের বসতবাড়িও । এখনই মাটি কাটা বন্ধ না হলে পুরো ঐ এলকা নদীভাঙনের ঝুঁকির মধ্যে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে আরো জানা যায়, আড়িয়ালখাঁ ও কুমার নদীর উত্তর মহিষেরচর গ্রামের দুটি স্থানে, একই ইউনিয়নের কাতলা বাহেরচরে দুটি স্থানসহ জেলার কমপক্ষে ২০টি স্থানে মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে। এসব মাটি বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে ইটভাটায়।
উত্তর মহিষেরচর শিকদার বাড়ি জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা আলমগীর শিকদার বলেন, আমাদের গ্রামে স্থানীয় ইলিয়াস চৌকিদার রাতের আঁধারে আড়িয়াল খাঁ নদের পাড়ের মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছেন। আমি এর প্রতিবাদ করায় আমাকে হুমকি দিয়েছেন,এমনকী আমার চোখ তুলে ফেলারও হুমকি দিয়েছেন তিনি। একই গ্রামের বাসিন্দা আসাদুজ্জামান সাইফ বলেন, আমরা বহুবার প্রশাসনকে জানিয়েছি। তারপরও মাটি চুরি থামানো যায়নি। প্রায় প্রতিদিন রাতের আঁধারেই তারা ট্রলারে করে মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছেন। মাটি কাটা বন্ধ না হলে পুরো গ্রামটি হুমকির মধ্যে পড়বে।
আরেক বাসিন্দা মিন্টু সরদার বলেন, প্রতিদিন রাতেই এখান থেকে মাটি চুরি করে নিয়ে যায় তারা। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের বসতবাড়ি ও ফসলি জমি সব নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। আমরা এর প্রতিকার চাই। একই এলাকার কাদের সরদার বলেন, আমার ফসলি জমির পাশে থেকেই মাটি কাটা হয়েছে এবং এতে আমার জমিতে ফাটল দেখা দিয়েছে। এরকম অনেকের জমি হুমকির মধ্যে রয়েছে।
স্থানীয় বাবুল চৌকিদার বলেন, আমার প্রায় তিন কাঠা জমি থেকে জোর করে ও রাতের আঁধারে মাটি কেটে নিয়ে গেছেন ইলিয়াস চৌকিদার।আরেক ভুক্তভোগী খলিল চৌকিদার বলেন, আমার জমি থেকেও চুরি মাটি কেটে নিয়ে গেছে ইলিয়াস চৌকিদার গংয়েরা। এতে আমার জমি হুমকির মুখে আছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় অনেকেই বলেন, আমরা প্রশাসনকে বিষয়টি জানালে মাঝে-মধ্যে দু-একবার প্রশাসনের লোকজনের দূর্বল অভিযান চললেও তা সাময়িক প্রভাব ফেলে মাত্র । অজ্ঞাত কারণে ইলিয়াস চৌকিদার আবার সাবেক বহাল হয়ে যায়, বুক ফুলিয়ে আবার কাজ চালিয়ে যায়। বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলন মাদারীপুর জেলা শাখার সভাপতি ও সাধারণ যথাক্রমে- শরীফ মোঃ ফায়েজুল কবীর ও এ্যাডভোকেট আবুল হাসান সোহেল বিষয়টি জানতে পেরে সংশ্লিষ্ট নদী ও নদীর মাটি খেকো ইলিয়াস চৌকিদার এর সাথে কথা বলে তাকে জানান, নদীর তলদেশ থেকে সরকারী অনুমোদন ব্যতিরেকে মাটি বা বালূ উত্তোলন করা, খনন করা মারাত্বক ফৌজদারী অপরাধ এবং এমন বেআইনি কাজ আর করা যাবে না- এ ব্যাপরে ইলিয়াস চৌকিদার বলেন, আমি আগে কয়েকবার মাটি কেটেছি কিন্তু এখন আর কাটি না। তিনি কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন। এহেন পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগী, স্থীনীয় জনগন, নদীবাঁচাও আন্দোলন, মাদারীপুর জেলা শাখা ও সচেতন মহল মনে করে- অবিলম্বে জড়িতদের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনকে থেকে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে,কোন ভাবেই মাটিখেকোদের ছাড় দেয়ার কোনো অবকাশ নেই। এ ব্যাপারে মাদারীপুর উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ বলেন, নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোতে নিয়মিত টহল ও মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি অবৈধ মাটি খনন বন্ধে জরুরি ভিত্তিতে আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।
মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক আফসানা বিলকিস বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে, যারা নদ-নদীর মাটি কাটছেন তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
Leave a Reply