
বগুড়া প্রতিনিধিঃ
বগুড়ার গাবতলী উপজেলার সুখানপুকুর ইউনিয়নের তেলিহাটা গ্রামে শনিবার (২৪ জানুয়ারি) দিবাগত রাতে ঘটে যাওয়া এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা স্থানীয় পর্যায় ছাড়িয়ে এখন আইনের নৈতিকতা ও ন্যায়বিচার নিয়েই তীব্র প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
অনৈতিক কার্যকলাপের অভিযোগে স্থানীয় জনগণের হাতে একই কক্ষ থেকে আটক হন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম বগুড়া ইউনিটের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শিপন আলী এবং একই গ্রামের ইসমাইলের মেয়ে ঈশিতা। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর পুরো এলাকায় উত্তেজনা ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরেই ঈশিতার ওই বাড়িতে যাতায়াত নিয়ে সন্দেহ তৈরি হচ্ছিল। বিষয়টি নজরে আসায় এলাকাবাসী নজরদারি বাড়ায়। শনিবার গভীর রাতে দুজনকে একই কক্ষে অবস্থান করতে দেখে স্থানীয়রা হাতেনাতে আটক করলে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
প্রথমে উপস্থিত জনতার সামনে অ্যাডভোকেট শিপন আলী বিয়ের বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরে ঈশিতা জানান, শিপনের আগের ডিভোর্সের পর তার সঙ্গে পাঁচ লাখ টাকা কাবিনে বিয়ে হয়েছিল এবং গত ৫ সেপ্টেম্বর সেই বিয়ে সম্পন্ন হয়। তবে কোনো রেজিস্ট্রি কাবিননামা বা কাজির পরিচয় তিনি পাননি বলে অভিযোগ করেন।
ঈশিতার অভিযোগ, ইউনিয়ন পরিষদের আসন্ন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনার কারণে শিপন আলী বিয়ের বিষয়টি গোপন রাখেন এবং রাতের আঁধারে তার সঙ্গে দেখা করতেন। কাবিননামার কাগজ চাইলে তাকে ভয়ভীতি, মানসিক চাপ ও হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
এদিকে ঈশিতার বাবা ইসমাইল বলেন, বিয়ে ছাড়াই একজন পুরুষ নিয়মিত তার বাড়িতে যাতায়াত করায় সামাজিকভাবে তাকে চরম অপমান সহ্য করতে হয়েছে। একপর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিয়ের বিষয় অস্বীকার করে প্রচারণা চালানো হলে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তিনি আরও দাবি করেন, অভিযুক্ত অ্যাডভোকেটের বিরুদ্ধে আগেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে গাবতলী থানার ওসির নির্দেশে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি শান্ত করে। শেষ পর্যন্ত এলাকাবাসী ও উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে গভীর রাতে নতুন করে একজন কাজির মাধ্যমে ৭ লাখ টাকা মোহরানায় ঈশিতার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন অ্যাডভোকেট শিপন আলী। বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর রাতেই তিনি স্ত্রীকে নিয়ে নিজ বাসায় চলে যান বলে জানা গেছে।
তবে এই ঘটনার পর আলোচনা থেমে নেই। স্থানীয়দের পাশাপাশি আদালত প্রাঙ্গণ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, অ্যাডভোকেট শিপন আলীর বিরুদ্ধে অতীতেও একাধিক নারীকে হয়রানি করার অভিযোগ রয়েছে বলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সরলতার সুযোগ নিয়ে সম্পর্ক গড়ে তোলা, পরবর্তীতে শারীরিক সম্পর্কের পর মানসিক চাপ ও ব্ল্যাকমেইলের মতো গুরুতর বিষয়ও জনমনে আলোচিত।
এই প্রেক্ষাপটে সচেতন নাগরিক ও এলাকাবাসীর মধ্যে জোরালো দাবি উঠেছে—বিষয়টি যেন সংশ্লিষ্ট বার কমিটি ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিল সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত অ্যাডভোকেটের আইন পেশার লাইসেন্স বাতিলসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
জনসাধারণের মতে, যে ব্যক্তি আইনের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়ে আইন পেশায় যুক্ত, তিনি যদি বারবার আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে নিজেকে রক্ষা করার কৌশল তৈরি করেন এবং সাধারণ মানুষকে হয়রানি করেন, তাহলে তা সমাজে ভয়ংকর দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। এতে অন্যরাও উৎসাহ পেয়ে একই ধরনের অপকর্মে জড়িয়ে পড়ার সাহস পেতে পারে।
সচেতন মহলের অভিমত, এই ধরনের অভিযুক্ত অ্যাডভোকেট যেন ভবিষ্যতে কোনো সরকারি বা বেসরকারি আইনগত কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে না পারেন—সে বিষয়ে নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। আইনের রক্ষক যদি ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তাহলে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচারের জন্য কোথায় যাবে—এই প্রশ্নই এখন গাবতলীর অলিগলি থেকে আদালত প্রাঙ্গণ পর্যন্ত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।