
আব্দুল হালিম,বিশেষ প্রতিবেদক রংপুর :
ঢাকা ও পাবনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যবসায়িক বিনিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাজাপ্রাপ্ত প্রতারক ওয়াহেদুল ইসলাম ওরফে রাজীবকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রংপুর নগরীর বড়বাড়ি মরিচটারী এলাকা থেকে তাকে আটক করে মেট্রোপলিটন কোতয়ালী থানা পুলিশ।
ভুক্তভোগী ওমায়ের ইসলাম (৩৩), অবসরপ্রাপ্ত বিমানবাহিনীর একজন সার্জেন্ট, জানান—তার পরিচিত কামরান খান শাওন ও মেহেদী হাসান সাহসের মাধ্যমে রাজীবের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। রাজীব নিজেকে ‘আর.কে ট্রেডার্স’-এর মালিক এবং স্ত্রী দিপালী বেগম কে ভিন্ন নাম পরিচয়ে পরিচয় দিয়ে লাভজনক ব্যবসায় বিনিয়োগের প্রস্তাব দেন। তার কথায় বিশ্বাস করে ওমায়ের ইসলাম ২০২৪ সালের ২৩ ও ২৮ জানুয়ারি দুই দফায় মোট ৬৮ লাখ টাকা নগদ বিনিয়োগ করেন।
বিনিয়োগের বিপরীতে নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে একটি চুক্তিপত্র ও দুটি চেক প্রদান করা হলেও পরবর্তীতে কোনো লাভ তো দূরের কথা, মূল টাকাও ফেরত পাননি তিনি। বরং অভিযুক্তরা নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করে একপর্যায়ে টাকা দিতে অস্বীকার করেন। এমনকি মামলা করলে ব্রাশ ফায়ারে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী।
অপর ভুক্তভোগী ফরহাদ ইসলাম শান্ত একজন লন্ডন প্রবাসী, তিনি তার খালাতো বোনের স্বামী রাফিউল বারী নিউটনের মাধ্যমে পরিচিত হন ওয়াহেদুল ওরফে রাজিবের সাথে। রাফিউল বারী পরিচয়ের সময় ওয়াহেদুল ওরফে রাজিব কে সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে পরিচয় দেন। সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা হিসেবে বিশ্বাস করে ওয়াহেদুল ওরফে রাজিবের প্রতিষ্ঠানে উক্ত লন্ডন প্রবাসী ১ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করার পর থেকে লাপাত্তা ছিলেন ওয়াহেদুল ওরফে রাজিব। বিষয়টি নিয়ে রাজধানীর কাফরুল থানায় একটি মামলা চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।
রাজধানীর মিরপুর এলাকার ভুক্তভোগী জাকির হোসেনের সাথে কথা বলে জানা যায় ওয়াহেদুল ইসলাম ওরফে রাজিবের সাথে পরিচয়ের সময় নিজেকে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে পরিচয় দেন প্রতারক ওয়াহেদুল ইসলাম ওরফে রাজিব। এরপর তিনি রাজিবের প্রতিষ্ঠানে ১৭ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে সর্বশান্ত হয়ে নিজের পরিবার ভেঙেছেন। ঠিক একই অবস্থা হয়েছে মিরপুরের আরেক বাসিন্দা রাকিব হোসেনের।
ওমায়ের ইসলাম , ফরহাদ ইসলাম শান্ত, জাকির হোসেন, রাকিব হোসেন সহ ১১/১২ জন প্রতারণা চক্রের শিকার হয়েছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতারক ওয়াহেদুল ইসলাম বিভিন্ন সময় নিজেকে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আত্মীয়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সাবেক সরকারি কর্মকর্তা কিংবা উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তার পরিচয়ে মানুষের আস্থা অর্জন করতেন। তার নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র দেশের বিভিন্ন স্থানে সক্রিয় ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই চক্রে ভূয়া সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা, ভূয়া সরকারি আমলা এবং আইনী সহায়তার জন্য নির্ধারিত উকিলও রয়েছেন বলে জানান ভুক্তভোগীরা। শরীয়তপুরের বাসিন্দা ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা মোঃ মাসুম, সাতক্ষীরা জেলার মোঃ রাসেল মিয়াসহ আরো অনেকে এই চক্রের খপ্পরে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, একাধিক বিয়ে ও ভুয়া পরিচয়ের আড়ালে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন তিনি। রংপুরের মিঠাপুকুর, সাভারের রেডিও কলোনিসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়ও তার অবস্থানের তথ্য পাওয়া যায়। পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে নিজেকে বাঁচাতে এবং ভুক্তভোগীদের হয়রানি করতে মিথ্যা অপহরণ মামলা করতে অভ্যস্ত এই প্রতারক। রংপুর শহরের শাপলা চত্বর, বড়বাড়ী এবং আশপাশের এলাকায় শ্যালিকা স্বপ্না বেগমের নামে কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি কিনেছেন এই প্রতারক।
গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে রংপুর মেট্রোপলিটন কোতয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজাদ রহমান জানান, দীর্ঘদিন ধরে তাকে ধরতে অভিযান চালানো হচ্ছিল। অবশেষে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করে তাকে আটক করা হয়। পরবর্তীতে তাকে গাইবান্ধার ফুলছড়ি থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
প্রতারক ওয়াহেদুল ওরফে রাজিবের গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি উপজেলার উদাখালী ইউনিয়নের উত্তর কাঠুর গ্রামে। তিনি প্রায় ১০-১২ বছর আগে গ্রাম ছেড়েছেন বলে জানান ওয়ার্ড মেম্বার আইয়ুব আলী। ফুলছড়ির নিজ এলাকায় বহু অপকর্ম করেছেন বলেও উল্লেখ করেন স্থানীয়রা। ভুক্তভোগীরা দ্রুত বিচার এবং প্রতারিত অর্থ ফেরতের দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষায়, “এই প্রতারক চক্রের কারণে আমরা অনেকেই সর্বস্বান্ত হয়েছি। আমরা এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।