
নিয়ামতপুর (নওগাঁ) প্রতিনিধি:
একসময় আঁচড়ানোর পর ফেলে দেওয়া ‘উচ্ছিষ্ট’ চুলই এখন গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন সম্পদ। নিয়ামতপুর উপজেলা ও মান্দা উপজেলা ঘিরে, পাশাপাশি তানোর উপজেলা-কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে মানবচুল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনের এক বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। এই অঞ্চলের চৌবাড়িয়া হাট এখন মানবচুল বেচাকেনার আঞ্চলিক কেন্দ্র—যেখানে সপ্তাহে কোটি টাকারও বেশি লেনদেন হচ্ছে বলে ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন।
গ্রাম থেকে হাট: যেভাবে তৈরি হচ্ছে বাজার
নিয়ামতপুর উপজেলার শ্রীমন্তপুর, পাড়ঐল, ভাবিচা, হাজীনগর, রসুলপুর, চন্দননগর ও বাহাদুরপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখা গেছে—নারীরা অবসর সময়ে চুল বাছাই ও জট ছাড়ানোর কাজে ব্যস্ত। একই চিত্র তানোরের কামারগাঁ ও কলমা ইউনিয়নেও।
সংগ্রহ থেকে বাজার পর্যন্ত ধাপগুলো—
নারীরা আঁচড়ানোর পর ঝরে পড়া চুল আলাদা করে সংরক্ষণ করেন। ফেরিওয়ালারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে কাঁচা চুল সংগ্রহ করেন (প্রায় ৩,৫০০ টাকা/কেজি দরে)।
ক্ষুদ্র প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে চুল ধোয়া, শুকানো, জট ছাড়ানো ও দৈর্ঘ্য অনুযায়ী বাছাই করা হয়।
শুকিয়ে মানভেদে আলাদা করে চৌবাড়িয়া হাটে তোলা হয়।পাইকাররা কিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ বা রপ্তানির জন্য পাঠান।
মঙ্গলবার ছাড়া সপ্তাহে ছয় দিন বসে চৌবাড়িয়া হাট। প্রতিদিন গড়ে ৩০–৪০ কেজি চুল বিক্রি হয়। প্রতি হাটে প্রায় ৩ লাখ টাকার লেনদেন হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মূল্য ও লাভের হিসাব কাঁচা চুল ক্রয়মূল্য: আনুমানিক ৩,৫০০ টাকা/কেজি প্রক্রিয়াজাতের পর ওজন: ১ কেজি থেকে প্রায় ৬৫০ গ্রাম প্রক্রিয়াজাত চুল বিক্রয়মূল্য: গড়ে ৮,০০০ টাকা/কেজি ১২ ইঞ্চির বেশি লম্বা চুল: সর্বোচ্চ ২০,০০০ টাকা/কেজি ব্যবসায়ীরা জানান, লম্বা, কালো, অক্ষত ও রাসায়নিকমুক্ত চুলের চাহিদা বেশি। প্রক্রিয়াজাতকরণ, শুকানো, পরিবহন ও শ্রম খরচ বাদ দিয়েও ভালো মুনাফা থাকে।
নারীদের কর্মসংস্থান ও বাস্তবতা
এই খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত হয়েছে কয়েক হাজার পরিবার। অধিকাংশ কর্মীই অসহায় ও নিম্নআয়ের নারী। মজুরি কাঠামো: ৬০ গ্রাম চুল বাছাইয়ে ৬০ টাকা; দিনে গড়ে ১২০ টাকা আয়।
কাজের ধরন: সারাদিন বসে জট ছাড়ানো ও মান অনুযায়ী বাছাই। স্বাস্থ্যঝুঁকি: ধুলা ও ময়লা থেকে সর্দি-কাশি, অ্যালার্জি ও শ্বাসকষ্টের সমস্যা।
তবে কর্মীরা বলছেন, “বিকল্প কাজ না থাকায় এটিই ভরসা। সংসারে সামান্য হলেও স্বস্তি আসে।”
রপ্তানি বাজার ও সম্ভাবনা
বাংলাদেশ থেকে সংগৃহীত মানবচুল রপ্তানি হচ্ছে চীন, ভারত, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, জাপান ও কোরিয়ায়। এসব চুল মূলত—
পরচুলা (উইগ) তৈরিতে কসমেটিক ও বিউটি শিল্পে
এক্সটেনশন ও হেয়ারপিসে ব্যবহৃত হয়
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রাকৃতিক কালো চুলের চাহিদা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মান নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা গেলে এটি একটি সম্ভাবনাময় রপ্তানিমুখী শিল্পে পরিণত হতে পারে।
চ্যালেঞ্জ ও করণীয়:
শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করা
ন্যায্য মজুরি ও সামাজিক নিরাপত্তা
আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন ও শিল্পস্বীকৃতি
রপ্তানিতে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমানো
প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ সুবিধা
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পেলে এ খাত গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
যে চুল একসময় ছিল ‘উচ্ছিষ্ট’, আজ তা গ্রামীণ নারীর হাতে হয়ে উঠেছে স্বাবলম্বিতার প্রতীক। তানোর–নিয়ামতপুর–মান্দা অঞ্চলের চৌবাড়িয়া হাট ঘিরে গড়ে ওঠা এই ব্যবসা দেখিয়ে দিচ্ছে—উপেক্ষিত সম্পদও সঠিক উদ্যোগ, সংগঠন ও নীতিসহায়তা পেলে রূপ নিতে পারে সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।