
বিশেষ প্রতিনিধিঃ
দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও জনগণের মৌলিক অধিকার সুনিশ্চিত করার অভিযাত্রায় স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক জাঁকজমকপূর্ণ চিকিৎসক মহাসমাবেশে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি একটি আধুনিক, টেকসই ও জনবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলার রূপরেখা তুলে ধরেন। রাজধানীর এই সমাবেশে সারা দেশ থেকে আগত জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ চিকিৎসক, চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ এবং পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সমাবেশের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী দেশের সকল চিকিৎসকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান জ্ঞাপন করেন। পেশায় নিজে চিকিৎসক না হলেও চিকিৎসা বিজ্ঞানের মূল চেতনা এবং আধুনিক চিকিৎসা দর্শনের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বিখ্যাত আমেরিকান উদ্ভাবক ও উদ্যোক্তা টমাস এডিসনের একটি দূরদর্শী উক্তি উদ্ধৃত করেন।
উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে এডিসন বলেছিলেন- ভবিষ্যতের চিকিৎসক কোনো ওষুধ দেবেন না, বরং তিনি তাঁর রোগীদের মানবদেহের যত্ন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং রোগের কারণ ও তা প্রতিরোধের বিষয়ে আগ্রহী করে তুলবেন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, এডিসনের এক শতাব্দী আগের এই চিন্তাধারা বর্তমান সরকারের গৃহীত স্বাস্থ্যনীতির সাথে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ। সরকারের স্বাস্থ্য খাতের মূল নির্দেশক নীতিই হলো- ‘রোগ নিরাময়ের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’ (Prevention is better than cure)। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, দেশের সাধারণ মানুষকে যদি রোগব্যাধির প্রাথমিক কারণ, সঠিক পুষ্টি, পরিচ্ছন্নতা এবং রোগ প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে শুরু থেকেই সচেতন করা যায়, তবে বিপুলসংখ্যক জটিল রোগ প্রাথমিক অবস্থাতেই ঠেকানো সম্ভব।
এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার প্রচলিত স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন যে, জনগণকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও রোগ প্রতিরোধ বিষয়ে সচেতন করতে দেশজুড়ে অতিরিক্ত ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এই স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রতিটি ঘরে ঘরে গিয়ে সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্য সচেতনতার শিক্ষা দেবেন। তবে এই বিশাল বাহিনীকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে দেশের অভিজ্ঞ ও তরুণ চিকিৎসকদেরই অগ্রণী ভূমিকা ও প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সমাবেশে বক্তব্য প্রদানকালে প্রধানমন্ত্রী দেশের সচেতন রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে চলমান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক- ‘শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ’ নিয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাষ্ট্রের সার্বিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দেশের প্রতিটি মানুষের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সুতরাং, শিক্ষক, শিক্ষার্থী কিংবা চিকিৎসক- প্রকৌশলীর মতো পেশাজীবীরা যদি নিজস্ব রাজনৈতিক আদর্শে সচেতন থাকেন বা সংগঠিত হন, তা কোনোভাবেই অস্বাভাবিক বা অযৌক্তিক নয়।
তবে রাজনৈতিক সচেতনতার পাশাপাশি পেশাগত দায়িত্বের ভারসাম্য রক্ষার ওপর বিশেষ জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বা সক্রিয়তা যেন কোনো অবস্থাতেই মূল পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধার সৃষ্টি না করে। জনগণের সেবা নিশ্চিত করাই পেশাজীবীদের প্রধান ব্রত হওয়া উচিত।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, প্রথাগত রাজনীতির বাইরে এসে এখন রাজনীতিতে গুণগত ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনাই সময়ের প্রধান দাবি। রাজনীতি হতে হবে দেশের সেবা ও পেশাগত উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যম, ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থ অর্জনের হাতিয়ার নয়।
মহাসমাবেশে ড্যাব ও চিকিৎসক সমাজের প্রতিনিধিরা দেশের স্বাস্থ্য খাতকে আরও কার্যকর, গতিশীল ও সেবামুখী করতে ৭টি প্রধান প্রস্তাব ও দাবি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন।
প্রস্তাবগুলো নিচে উপস্থাপন করা হলো-
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চিকিৎসকদের এই দাবিসমূহ মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং এগুলোকে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও যৌক্তিক বলে অভিহিত করেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, ঢাকার বাইরে বিশেষায়িত চিকিৎসা পৌঁছানোর কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকাবাইরে একাধিক শিশু হাসপাতালসহ অন্যান্য বিশেষায়িত কেন্দ্র স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। বাকি প্রস্তাবগুলোও সরকার অত্যন্ত ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পর্যায়ক্রমে পর্যালোচনা ও বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার এক ভঙ্গুর ও চ্যালেঞ্জিং অবস্থায় দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। অতীতের ভুল নীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা দুর্বল অর্থনীতি, বিভক্ত প্রশাসন, এবং বিপর্যস্ত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে পুনর্গঠন করে বর্তমান সরকার দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, একটি অস্থিতিশীল অবস্থা তৈরির জন্য বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনের সুবিধাভোগীরা রাষ্ট্রযন্ত্রের নানা স্তরে এখনো সক্রিয় রয়েছে। সম্প্রতি দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতসহ বিভিন্ন সংবেদনশীল সেক্টরকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করা হলেও সরকারের সময়োপযোগী ও দূরদর্শী পদক্ষেপে তা ব্যর্থ করে দেওয়া হয়েছে।
প্রতিটি খাতকে স্বাবলম্বী ও টেকসই করার অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য খাতের সার্বিক আধুনিকায়নে সরকার দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী একটি ঐতিহাসিক লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করে বলেন, আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
এর পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে প্রযুক্তির ছোঁয়া আনতে দ্রুততম সময়ে দেশের সকল নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ (e-Health Card) ব্যবস্থা চালুর কাজ শুরু হয়েছে। এর ফলে ডিজিটাল উপায়ে প্রতিটি নাগরিকের চিকিৎসার ইতিহাস ও তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালকে ১০১ শয্যার আধুনিক হাসপাতালে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হচ্ছে।