
বিনোদন ডেস্কঃ
সংস্কৃতি এবং আধুনিকতার মিলনস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা আজকের নারী কি কেবল প্রথা মেনেই চলবেন, নাকি প্রথাকে নিজের মতো করে সংজ্ঞায়িত করবেন? এই প্রশ্নটি আবারও সামনে নিয়ে এসেছেন আন্তর্জাতিক তারকা প্রিয়াঙ্কা চোপড়া জোনাস। ২০২১ সালে বুলগারি (Bulgari) ব্র্যান্ডের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে ভারতে প্রথম ‘লাক্সারি মঙ্গলসূত্র’ উদ্বোধনের সময় প্রিয়াঙ্কা যে বক্তব্য রেখেছিলেন, তা ২০২৬ সালেও সমাজ এবং সম্পর্কের সমীকরণে সমান প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি প্রিয়াঙ্কার স্বামী নিক জোনাসের একটি বিশেষ অঙ্গভঙ্গি এবং সামাজিক মাধ্যমে এই ঐতিহ্যের আধুনিক রূপায়ন নিয়ে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে।
প্রিয়াঙ্কা চোপড়া সবসময়ই নিজেকে ‘বিরোধাভাস’ (Contradiction) এবং ‘আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের সংমিশ্রণ’ হিসেবে বর্ণনা করতে ভালোবাসেন। ২০২১ সালের সেই স্মরণীয় ইনস্টাগ্রাম লাইভে তিনি বলেছিলেন, আমি এমন একজন মানুষ যে আধুনিকতা এবং ঐতিহ্য উভয়কেই ধারণ করি। আমি মনে করি, আমি নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে নিজের জন্য সুন্দর একটি মঙ্গলসূত্র কিনব, আর এটাই আমার কাছে পুরুষতন্ত্র বা ‘পেট্রিয়ার্কি’ ভেঙে দেওয়ার একটি উপায়।’
তার এই বক্তব্য সেই সময় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। প্রিয়াঙ্কার মতে, কোনো অলঙ্কার বা প্রথা কেবল তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেটি চাপিয়ে দেওয়া হয় না, বরং নারীর নিজস্ব পছন্দে পরিণত হয়। তিনি আরও জানান যে, আধুনিক নারী হিসেবে তিনি এই অলঙ্কারের পেছনের দায়বদ্ধতা এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন। তিনি নিজেকেই প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আমি কি মঙ্গলসূত্র পরার ধারণাটি পছন্দ করি? নাকি এটি অতিরিক্ত পুরুষতান্ত্রিক?’
প্রথাগতভাবে মঙ্গলসূত্র গলায় পরা হলেও, প্রিয়াঙ্কা এটিকে একটি সমসাময়িক মোড়ক দিয়েছেন। সম্প্রতি তাকে এই ঐতিহ্যবাহী অলঙ্কারটি ব্রেসলেটের মতো করে কব্জিতে পরতে দেখা গেছে, যা ইন্টারনেটে শোরগোল ফেলে দিয়েছে। কালো এবং সাদা পুঁতি যা অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা করার প্রতীক সেটি বজায় রেখেও এর নকশায় আনা হয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া।
প্রিয়াঙ্কা জানান, তিনি এই ‘কনটেম্পরারি’ বা আধুনিক মঙ্গলসূত্রটি জিন্স এবং শার্টের সঙ্গে পরতে পছন্দ করেন। তার ভাষায়, ‘এটি দেখতে অত্যন্ত কুল (Cool) লাগে। ‘এটি কেবল একটি গয়না নয়, বরং তার কাছে নিজের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকার একটি মাধ্যম, যা তাকে সুরক্ষা দেয় এবং তার ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তোলে।
প্রতিবেদনটিতে নিক জোনাসের একটি বিশেষ ভূমিকার কথা উঠে এসেছে। সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ এবং মনোবিজ্ঞানীদের মতে, নিক এবং প্রিয়াঙ্কার সম্পর্কের রসায়ন কেবল বড় কোনো উৎসব বা দামী উপহারের ওপর টিকে নেই। নিকের ছোট ছোট কিন্তু অর্থপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি এই দম্পতির বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ধরনের প্রতিদিনের ছোটখাটো যত্নেই ভালোবাসা দীর্ঘস্থায়ী হয়।
সিএমআরআই (CMRI)-এর কনসালট্যান্ট সাইকিয়াট্রিস্ট ড. অম্বরীশ ঘোষ এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘আজকের দিনে মানুষ অনেক বেশি ব্যস্ত এবং খামখেয়ালি হয়ে উঠেছে। তারা এখন বিবাহবার্ষিকী বা জন্মদিনের মতো বিশেষ দিনের অপেক্ষায় না থেকে প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজে সঙ্গীর কাছ থেকে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ বা স্বীকৃতি পেতে পছন্দ করে।’
ড. ঘোষের মতে, এই ছোট ছোট অঙ্গভঙ্গি সঙ্গীকে অনুভব করায় যে তারা প্রিয়জনের চিন্তায় সবসময় আছেন। এটি কেবল সাশ্রয়ী নয়, বরং কর্মব্যস্ত জীবনে একে অপরের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার সবথেকে সহজ এবং কার্যকর উপায়।
আজকের যুগে যখন সম্পর্কগুলো অত্যন্ত ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে এবং মানুষ স্থিতিশীল হওয়ার আগে একাধিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে যায়, তখন প্রিয়াঙ্কা এবং নিকের মতো দম্পতিদের উদাহরণ অনেকের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে। একে অপরের পেশাদার জীবন এবং ব্যক্তিগত পরিসরকে সম্মান জানিয়েও কীভাবে শৈশবের আনন্দ ধরে রাখা যায়, সেটিই এখনকার সম্পর্কের মূলমন্ত্র হওয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি শক্তিশালী সম্পর্কের চাবিকাঠি হলো একে অপরের দৈনন্দিন রুটিন এবং পেশাদার জীবনে হস্তক্ষেপ না করেও ছোট ছোট জিনিসের মধ্যে আনন্দ খুঁজে নেওয়া। এতে পকেটে টান পড়ে না, কিন্তু মনের টান বাড়ে।