
ড. আব্দুল ওয়াদুদ
সমাজে আমরা প্রায়ই দেখি—কোনো নেতা, সেলিব্রিটি কিংবা ক্ষমতাবান ব্যক্তিকে ঘিরে ভিড় লেগেই থাকে। মানুষ আগ্রহ নিয়ে তাদের সাথে ছবি তোলে, সেই ছবি গর্ব করে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করে।
কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার—যখন সেই ব্যক্তিই ক্ষমতা হারায় বা কোনো বিতর্কে জড়িয়ে বিপদে পড়ে, নৈতিক স্খালন হয় তখন তার সাথে তোলা ছবিগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়। লুকানো হয়।
কেন ঘটে এমন?
এই আচরণের পেছনে সামাজিক, মনোবৈজ্ঞানিক ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা আছে।
সামাজিক মর্যাদা ও “আমি-ও-গুরুত্বপূর্ণ” সাইকোলজি:
জনপ্রিয় মনোবিজ্ঞানী আব্রাহাম মাসলোর “স্বীকৃতি ও মর্যাদা”-র চাহিদা মানুষের আচরণকে গভীরভাবে পরিচালনা করে।
ক্ষমতাশালী ব্যক্তির সাথে ছবি মানে—নিজের মর্যাদা প্রমাণের সহজ উপায়। মানুষ আসলে বলতে চায়—
“আমি এমন একজন, যে ক্ষমতার কাছে পৌঁছাতে পারে” এ আচরণকে status-seeking behavior বলা হয়।
যেখানে ক্ষমতা, দাপট, নামডাক = মূল্যবান “সামাজিক মুদ্রা”।
এই মুদ্রা দিয়ে মানুষ সমাজে নিজেদের উচ্চতর করে দেখানোর প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে।
সম্মান পাওয়ার তীব্র ইচ্ছা (Impression Management):
সমাজে নিজের অবস্থান দেখাতে গিয়ে মানুষ ভালো ইমপ্রেশন তৈরি করতে চায়। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক-সংস্কৃতি।
একটি প্রভাবশালী নেতার সাথে ছবি—
একদিকে প্রশংসার বন্যা, অন্যদিকে সামাজিক বৈধতা—
“দেখ, আমি কত প্রভাবশালী লোকের সাথে মিশি!” এটি মূলত দেখানোর মনোভাব—যাকে মনোবিজ্ঞানে বলে impression management।
ক্ষমতার ছায়ায় আশ্রয় (Patronage Psychology):
সামাজিক বাস্তবতায় ক্ষমতা মানেই—চাকরি পাওয়া, ভালো পোস্টিং,
তদবিরে সুবিধা, মামলা-হামলায় রক্ষা,
সুযোগ-সুবিধা।
এ কারণে ছবি তুলে মানুষ বোঝাতে চায়—
“আমার পিছনে ক্ষমতা আছে, আমাকে বিরক্ত করলে শক্তির ব্যবহার হবে।” অর্থাৎ ছবি একধরনের মানসিক নিরাপত্তা অস্ত্র।
BIRG: বিজয়ের আলোয় ভাসা :
মনোবিজ্ঞানে একটি ধারণা আছে—
Basking In Reflected Glory
অর্থাৎ বিজয়ী, সফল এবং ক্ষমতাবান ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক দেখিয়ে নিজেকে উজ্জ্বল দেখানো। যেমন—
দল জিতলে আমরা বলি “আমরা জিতেছি”,
কিন্তু হারলে “ওরা হেরেছে”। ক্ষমতাবান নেতার সাথে ছবি =
তার সাফল্যের আলো নিজের উপর ফেলা।
সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে পরিচয়-রাজনীতি:
সমাজবিজ্ঞান বলছে—
মানুষ ব্যক্তিগত পরিচয়ের চেয়ে গ্রুপ পরিচয় বেশি মূল্য দেয়।
ক্ষমতাবানদের সাথে সম্পর্ক দেখিয়ে মানুষ বলতে চায়—
“আমি উচ্চমর্যাদার দলের সদস্য।”
ডুর্খেইম, বোর্দিওসহ বহু সমাজবিজ্ঞানী ক্ষমতা ও মর্যাদা অর্জনের এই আচরণকে সামাজিক মূলধন (social capital) হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
যা দিয়ে মানুষ রাজনৈতিক অংশীদারিত্ব,সামাজিক অবস্থান, পেশাগত সুবিধা ছিনিয়ে নিতে পারে। এটি মূলত প্রতীকী ক্ষমতা (symbolic power)—
ছবি হলো সেই ক্ষমতার দৃশ্যমান রূপ।
রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রভাবসুবিধাবাদ ও তোষামোদি:
বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশে রাজনীতির একটি বড় বাস্তবতা—
ক্ষমতা = সুযোগ
ক্ষমতা নেই = অচেনা মুখ
যে নেতা যত ক্ষমতাবান, তার চারপাশে তত ভিড়।
ক্ষমতা কমলেই ভিড় উধাও।
বাংলার প্রবাদ—
“পাঞ্জা ভাঙ্গলে কুকুর চিনে না।” অর্থাৎ—
রাজনৈতিক আনুগত্য অনেক সময়
নীতি বা আদর্শ নয়
বরং ব্যক্তিগত লাভের হিসাব। সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশাই ছবি তোলার সবচেয়ে বাস্তব কারণ।
যখন ক্ষমতা যায়: CORF তত্ত্ব
ক্ষমতাধারী নেতার বিপদে মানুষ কেন ছবি লুকিয়ে ফেলে?
এটি হলো—
Cutting Off Reflected Failure (CORF)
অর্থাৎ—
সংকটে পড়া ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। যেমন দুর্নীতির মামলা, ক্ষমতা পরিবর্তন, জনরোষ, রাজনৈতিক পরিবর্তন নৈতিক স্খলন হলে তৎক্ষণাৎ ছবি মুছে ফেলা শুরু হয়।
নিজেকে বলতে চায়—
“আমি তো তার লোক ছিলাম না!” এখানে আত্মরক্ষাই প্রধান।
নৈতিকতা নয়, জনপ্রিয়তার দৌড়:
রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যখন নীতি-আদর্শ পিছিয়ে যায়,
তখন মানুষ—ক্ষমতার কাছে দৌড়ায়, ক্ষমতাহীনতায় দূরত্ব রাখে। ফলে জনগণের আচরণ হয়ে যায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক
রাষ্ট্র বা সমাজকেন্দ্রিক নয়। একে বলা যায়—
নৈতিক সংকট
যেখানে নীতি নয়,
ক্ষমতার ব্যবহারই প্রধান মাপকাঠি।
সেলিব্রিটি কালচার, ডিজিটাল যুগ ও (Self-Branding):
আজ ছবি শুধু স্মৃতি নয়
ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড।
রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্থানে স্টেপিং স্টোন LinkedIn—এ ছবি দিলে চাকরির সুযোগ, Facebook—এ ছবি দিলে সামাজিক জনপ্রিয়তা এমনকি—
স্থানীয় নেতারা ছবির কারণে পরিচয়পত্র ছাড়াই কাজ আদায় করতে পারেন। এ সমাজে ছবি = ক্রেডিট কার্ড যা সুযোগ কিনে আনে।
এই আচরণের সামাজিক-রাজনৈতিক ফল:
এমন মনোভাব সমাজে কিছু নেতিবাচক প্রভাব আনে—
তোষামোদি বৃদ্ধি করে। যোগ্যতার বদলে সুবিধাবাজ সফল হয়
দুর্বল রাজনৈতিক সংস্কৃতি নীতি-আদর্শ গুরুত্ব হারায়
জনগণের চরিত্রে দ্বৈততা মর্যাদা পেতে চাটুকারিতা বেড়ে যায়
নেতা-সমাজ দূরত্ব প্রকৃত জনসম্পৃক্ততা কমে, সৎ ও যোগ্য মানুষ রাজনীতি বিমুখ নীতির চেয়ে ছবি-রাজনীতি মুখ্য
মনোবিজ্ঞানের সারকথা
মানুষ সবসময় খোঁজে—
স্বীকৃতি,প্রতিপত্তি, নিরাপত্তা,সুযোগ।
নেতা বা ক্ষমতাবান ব্যক্তির সাথে ছবি— এই চারটি চাহিদা সহজে পূরণ করে বলে
এ আচরণ মানবস্বভাবে গভীরভাবে রোপিত।
ক্ষমতাবানদের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার মানসিকতা—
ক্ষমতার সন্ধানে মানুষের প্রাচীন প্রবৃত্তির আধুনিক প্রকাশ।
যখন ক্ষমতা থাকে—
সবাই কাছে আসে।
যখন ক্ষমতা যায়—
সেই সম্পর্কই অস্বীকার করা হয়। ক্ষমতার সাথে সম্পর্ক সমাজে গর্ব ও নিরাপত্তা দেয়,
আবার ক্ষমতা হারালে লজ্জা ও বিপদে ফেলে।
এ আলো-ছায়ার মধ্যেই সমাজ ও মানুষের প্রকৃত চরিত্র উন্মোচিত হয়ে যায়—
যেখানে নীতির চেয়ে ক্ষমতার মূল্য বেশি।
এ বাস্তবতাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক নয়, মূল্যবোধের সাথে সম্পর্কই সবচেয়ে স্থায়ী শক্তি।
ড. আব্দুল ওয়াদুদ
ফিকামলি তত্ত্বের জনক, মনোবিজ্ঞান গবেষক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ওয়াইল্ড লাইভ বিশেষজ্ঞ
মনোবিজ্ঞান গবেষক।