বিশেষ প্রতিনিধিঃ
বাংলাদেশে নারীরা অনলাইনে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছেন। হয়রানি, আর্থিক প্রতারণা, যৌন ও ছবিভিত্তিক নির্যাতন, ভুয়া অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পরিচয়ের অপব্যবহার এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এক গবেষণায় অংশ নেওয়া ৪৫ দশমিক ৫ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, তাঁরা অনলাইনে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ভুক্তভোগীদের ৫৬ শতাংশ সামাজিক মাধ্যমে অভিযোগ জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি। পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছেন মাত্র ৪ দশমিক ৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও ডিজিটালি রাইটের যৌথ গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। গবেষণাটির শিরোনাম ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং অ্যান্ড অ্যাড্রেসিং টেকনোলজি-ফ্যাসিলিটেটেড জেন্ডার-বেজড ভায়োলেন্স ইন বাংলাদেশ’।
গবেষণায় বলা হয়েছে, অনলাইনে সহিংসতার শিকার হয়েও প্রতিকার না পাওয়ায় অনেক নারী সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার কমিয়ে দিচ্ছেন। কেউ কেউ পড়াশোনা ও চাকরি ছাড়তে কিংবা বাসস্থান পরিবর্তন করতেও বাধ্য হচ্ছেন।
চলতি বছরের ৭ থেকে ১৩ জানুয়ারি গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকা এবং কয়েকটি উপজেলায় ১৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সী ৫২১ নারী ও কিশোরীর ওপর জরিপ চালানো হয়। এ ছাড়া চারজন গুরুত্বপূর্ণ তথ্যদাতার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। অনলাইন সহিংসতার অভিজ্ঞতা রয়েছে, এমন আট নারীর বিস্তারিত সাক্ষাৎকারও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণার ফল অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী নারীদের ৪৫ দশমিক ৫ শতাংশ প্রযুক্তির মাধ্যমে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। সক্রিয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে এ হার ৬৩ দশমিক ৭ শতাংশ। ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণী ও শিক্ষার্থীদের ৪৯ শতাংশ এ ধরনের সহিংসতার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা নেওয়া নারীদের মধ্যে এ হার ৭৬ দশমিক ৭ শতাংশ।
ভুক্তভোগীদের ৫৭ দশমিক ৪ শতাংশ গত ১২ মাসের মধ্যে এ ধরনের সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৬৫ দশমিক ৮ শতাংশ একটি এবং ৩৪ দশমিক ২ শতাংশ একাধিক ধরনের সহিংসতার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
হয়রানির প্রধান মাধ্যম ফেসবুক-মেসেঞ্জার
গবেষণায় অনলাইন সহিংসতার কয়েকটি ধরন চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হয়রানি ও লিঙ্গভিত্তিক শোষণ, আর্থিক প্রতারণা, যৌন ও ছবিভিত্তিক নির্যাতন, ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি করে পরিচয়ের অপব্যবহার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন এবং অনুসরণ। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে নারীদের ভুয়া ছবি ও ভিডিও তৈরি করেও হয়রানি করা হচ্ছে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ভুক্তভোগীদের ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ হয়রানি ও লিঙ্গভিত্তিক শোষণের শিকার হয়েছেন। আর্থিক শোষণ বা প্রতারণার অভিজ্ঞতা হয়েছে ৩৭ দশমিক ১ শতাংশের। যৌন হয়রানি ও ছবিভিত্তিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ। ভুয়া অ্যাকাউন্ট বা পরিচয়ের অপব্যবহারের মুখে পড়েছেন ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন কিংবা অনুসরণের শিকার হয়েছেন ১৫ দশমিক ২ শতাংশ।
এসব ঘটনার বড় অংশ ঘটছে ফেসবুক ও মেসেঞ্জারে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪০ শতাংশ ঘটনা মেসেঞ্জারের চ্যাটে এবং ৩৭ শতাংশ ফেসবুকে সংঘটিত হয়েছে। এআই ব্যবহার করে নারীর মুখাবয়ব ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য বিকৃত করে ছবি বা ভিডিও তৈরি এবং সেগুলো ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে প্রতারণার ঘটনাও শনাক্ত হয়েছে। তবে এ ধরনের ঘটনার নির্দিষ্ট হার গবেষণায় উল্লেখ করা হয়নি।
অনলাইন নিরাপত্তার প্রশিক্ষণ পাননি ৬৭ শতাংশ
অনলাইনে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও নারীদের প্রস্তুতিতে ঘাটতি রয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৬৭ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, তাঁরা কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অনলাইন নিরাপত্তাবিষয়ক প্রশিক্ষণ পাননি। মাত্র ৯ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যবহার করেন দ্বিস্তরীয় পরিচয় যাচাই পদ্ধতি। পাসওয়ার্ড ব্যবস্থাপনার বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহারের হার মাত্র ৫ শতাংশ। অন্যদিকে, ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ নারী মনে করেন, অনলাইনে হয়রানির ঘটনা স্বাভাবিক।
সহিংসতার শিকার নারীদের ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশ অপরাধীদের ব্লক করেছেন। ভয়ের কারণে ২১ শতাংশ সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৭১ দশমিক ৬ শতাংশের ধারণা, অনলাইন সহিংসতার শিকার হলে সমাজে ভুক্তভোগীদেরই দোষারোপ করা হয়।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ, অনলাইন সহিংসতার প্রভাব শুধু ভার্চুয়াল জগতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর নেতিবাচক প্রভাব নারীদের সামাজিক ও পেশাগত জীবনেও ছড়িয়ে পড়ে।
গবেষণা প্রকাশ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, সহিংসতার কাঠামোগত দুর্বলতা ও সংকট চিহ্নিত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অংশীজনের দায়িত্ব অনুযায়ী সমাধানের পথ দেখানোই এ গবেষণার লক্ষ্য। গবেষণায় দেওয়া সুপারিশ বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। লিঙ্গবৈষম্য দূর করা না গেলে সাইবার অপরাধের নতুন নতুন ধরন ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো কঠিন হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি এবং দ্বিস্তরীয় পরিচয় যাচাই পদ্ধতি সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে গৃহবধূ ও প্রবাসীদের স্ত্রীরা আর্থিক শোষণ ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। প্রাথমিক জরিপে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও যৌনকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাঁদের অভিজ্ঞতা জানতে ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত পরিসরে গবেষণা পরিচালনার প্রয়োজন রয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ ফউজুল আজিম অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর শর্তাবলি সহজবোধ্য বাংলায় প্রকাশ, অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এসব ক্ষেত্রে সরকারের কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের উপপুলিশ কমিশনার লিজা বেগম বলেন, ভুয়া পরিচয়ে খোলা অ্যাকাউন্টের ব্যবহারকারীদের শনাক্ত করা, ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ এবং এআইয়ের অপব্যবহারজনিত অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে পুলিশকে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। এসব সমস্যা সমাধানে মানসম্মত তদন্ত নির্দেশিকা প্রণয়ন, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় এবং ভুক্তভোগীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু, প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও পাঠাগার সম্পাদক রীনা আহমেদসহ বিভিন্ন নারী অধিকার ও উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা।
মোঃ কামরুজ্জামান মিলন
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক তুহিন প্রিন্টিং প্রেস ফকিরাপুল ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
মোবাইল: ০১৯২৭-৩০২৮৫২/০১৭৫০-৬৬৭৬৫৪
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত