সিরাজগঞ্জ:ভেটুয়া নামটির সাথে জড়িয়ে আছে কেবলই এক নদীর কলতান নয়, বরং যমুনার বুকে জেগে ওঠা চরের অন্তত দুই লাখ মানুষের অন্তহীন দীর্ঘশ্বাস ও যাতায়াতের জনদুর্ভোগ। সিরাজগঞ্জের কাজিপুর ও সদর এবং জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার প্রায় ১৫টি ইউনিয়নের অবহেলিত মানুষের কাছে এই ‘ভেটুয়া ঘাট’ যেন এক অন্তহীন যন্ত্রণার নাম। নদীর জল গড়ায়, দিন বদলায়, কিন্তু চরের মানুষের ভাগ্য বদলায় না। যমুনার একটি শাখা নদী এই ভেটুয়া, যা পশ্চিমে সিরাজগঞ্জের সদর ও কাজিপুর উপজেলার আটটি এবং পূর্বে জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার সাতটি ইউনিয়নকে বিভক্ত করে রেখেছে। অথচ এই নদীকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় দুই পাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকা। এমনকি টাঙ্গাইলের ভূয়াপুরের কিছু মানুষও এই পথেই ব্যবসা-বাণিজ্যের পসরা সাজান।
নদী পারাপারের জন্য নেই কোনো টেকসই মাধ্যম। বছরের পর বছর ধরে একটি সেতুর অভাবে থমকে আছে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন। কাজিপুরের মনসুরনগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান কামরুল হাসান গোলজার ক্ষোভ ও আক্ষেপের সুরে বলেন, “ভেটুয়াঘাট হয়ে প্রতিদিন কমপক্ষে দেড় থেকে দুই হাজার মানুষ স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, বাজার এবং সরকারি অফিসে যান।”
শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে মুমূর্ষু রোগী, সবাইকে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই ঘাট পার হতে হয়। নির্বাচন আসে, নির্বাচন যায়। বারবার মিলেছে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরিদর্শন আর প্রতিশ্রুতির রঙিন আশ্বাস। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি; এখনো মেলেনি সরকারি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ। প্রতিশ্রুতিগুলো যেন যমুনার জলের মতোই ভেসে গেছে। দুই লাখ মানুষের এই কান্নার অবসান ঘটাতে এবং চরের বুকে সমৃদ্ধির আলো জ্বালাতে ভেটুয়া নদীর ওপর একটি স্বপ্নের সেতু এখন সময়ের দাবি। কর্তৃপক্ষ কি আর একবার এসে দেখে যাবেন এই জনপদের মানুষের কষ্ট, নাকি আশ্বাসেই কেটে যাবে আরও এক দশক— এমনটাই প্রশ্ন এখন দুই পাড়ের ভুক্তভোগী মানুষের।
নদী যার জীবন, নদীই তার মরণ। যে নদী দু’কূলের মানুষকে বাঁচার রসদ জোগায়, সেই নদীই আবার কেড়ে নেয় স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ। সিরাজগঞ্জের কাজিপুরের যমুনার এক অবাধ্য শাখা নদী আজ চরাঞ্চলের লক্ষ মানুষের জীবনে এক জীবন্ত দীর্ঘশ্বাস। নদীটির বুক চিরে প্রতিদিন হাজারো স্বপ্ন পারাপার হয় দু’টি কাঠের নৌকায়, কিন্তু বর্ষা এলেই সেই স্বপ্ন রূপ নেয় আতঙ্কে।
ভেটুয়াঘাটের এপার-ওপার যেন দুটি ভিন্ন পৃথিবী। পূর্ব পারের অবহেলিত মানুষের নাগরিক সুবিধার একমাত্র চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে পশ্চিম পারে। আর পশ্চিম পারের মানুষের জীবন-জীবিকা বাঁধা চরাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র ঐতিহ্যবাহী নাটুয়ারপাড়া হাটের সাথে। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ ক্রেতা-বিক্রেতা—সবারই প্রতিদিনের নিয়তি এই শান্ত অথচ রূপ পরিবর্তনকারী নদীটি। প্রতিদিন দুটি খেয়া নৌকায় মানুষ, মালামাল আর অবলা গবাদি পশু বোঝাই করে চলে পারাপার। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিটি ট্রিপে সাত থেকে নয় মিনিটের এই নদী পারাপার এক চিলতে স্বস্তি দিলেও, বর্ষা আসতেই বদলে যায় সব দৃশ্যপট।
বর্ষার ছোঁয়ায় শান্ত রূপ হারিয়ে এই শাখা নদী যেন ধারণ করে এক প্রলয়ংকরী রূপ। বুক ফুলিয়ে নদী হয়ে ওঠে আরও প্রশস্ত, আর পানির নিচে সৃষ্টি হয় তীব্র ঘূর্ণাবর্তের এক মরণফাঁদ। তখন বুক কেঁপে ওঠে ঘাটের মুদি দোকানি রফিকুল মাঝির মতো হাজারো মানুষের। তিনি জানান, বর্ষায় মাঝে মাঝেই নৌকা চলাচল করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, আর তখনই ঘটে যায় নানা দুর্ঘটনা। নদী পার হতে গিয়ে তলিয়ে যায় কত মানুষের স্বপ্ন ও ঘাম।
এই যাতায়াত সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। ভেটুয়া ঘাটের পূর্বপাড়ে অবস্থিত আলহাজ্ব ফরহাদ আলী কলেজের অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ তাঁর বুকভরা আর্জি নিয়ে বলেন, “নদী পারাপারের এই চরম অসুবিধার কারণে আমার প্রতিষ্ঠানসহ স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বর্ষাকালে প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। তারা ক্লাসে আসতে পারে না, থমকে যায় তাদের শিক্ষা জীবন।” শুধু শিক্ষা নয়, স্থবির হয়ে পড়ে চরের মূল চালিকাশক্তি কৃষিও। দু’পাড়ের কৃষকেরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে সোনার ফসল ফলায়, তা কাটার পর বাজারে পরিবহনের কোনো সহজ উপায় থাকে না। ফলে ফসলের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হতে হয় তাদের।যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই দুঃখের অবসান ঘটাতে পারে কেবল একটি স্থায়ী সেতু। নাটুয়ারপাড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের চরাঞ্চলবাসীর এই প্রাণের দাবিকে তুলে ধরে জানান, গত মাসেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসে প্রস্তাবিত স্থানটি পরিদর্শন করে গেছেন। তিনি আশাবাদী কণ্ঠে বলেন, “নদীর ওপর যদি একটি সেতু নির্মিত হয়, তবেই চরের লক্ষ মানুষের এই চিরন্তন সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে। বিশেষ করে, আমাদের মেহনতি কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত পণ্য সহজেই দেশের যেকোনো প্রান্তে পৌঁছে দিতে পারবে।”
এখন কেবল অপেক্ষা প্রশাসনের সদিচ্ছার। চরের লক্ষ মানুষের বুকভরা আশা, ভেটুয়া নদীর ওপর দ্রুতই দৃশ্যমান হবে একটি স্বপ্নের সেতু। ঘুচে যাবে দুই পারের দূরত্ব, আর নদীর বুক চিরে বয়ে যাবে চরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য বদলের নতুন হাওয়া।
উপজেলা এলজিইডি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত মাসে চীনা প্রকৌশলীদের একটি প্রতিনিধি দল কাজিপুরের সংশ্লিষ্ট এলাকাটি সরেজমিনে পরিদর্শন ও জরিপ করে। এ বিষয়ে কাজিপুরের এলজিইডি প্রকৌশলী মো. মুনসুরুল হক জানান, এলাকা জরিপ করতে গত মাসে একটি চীনা প্রকৌশলীদল এসেছিলেন। তবে সেতু নির্মাণের বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত আমাদের জানানো হয়নি বা এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আমি অবগত নই।
এদিকে সেতুটি নির্মাণের বিষয়ে অত্যন্ত আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সিরাজগঞ্জ-১ (কাজিপুর ও সদরের আংশিক) আসনের সংসদ সদস্য সেলিম রেজা। তিনি জানান, সম্প্রতি চীনা প্রকৌশলীদের একটি বিশেষ দল এলাকাটি পরিদর্শন করেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের যাতায়াতের দুর্ভোগের অবসান ঘটাতে এবং জনস্বার্থে এখানে একটি সেতু নির্মাণের জন্য অবিলম্বে কার্যকর ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
মোঃ কামরুজ্জামান মিলন
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক তুহিন প্রিন্টিং প্রেস ফকিরাপুল ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
মোবাইল: ০১৯২৭-৩০২৮৫২/০১৭৫০-৬৬৭৬৫৪
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত