শরীফ ফায়েজুল কবীর,মাদারীপুর প্রতিনিধিঃ
ভোরের শিশির ভেজা সকালের সূর্যের সোনালী আলো ফুটতে না ফুটতেই 'সোনালী আঁশ' পাট আহরণে কাস্তে হাতে মাঠে ছুটে চলছেন মাদারীপুরের কৃষাণ-কৃষাণি। কেউ ব্যস্ত ফসলি ক্ষেতে কাদা-পানির মধ্যে পাট কাটতে, কেউবা আঁটি বেঁধে মাথায় করে অথবা নৌকা কিংবা ভ্যানে করে টেনে এনে পাট পচনক্রিয়ায় বা জাগ দিতে ব্যস্ত, কেউবা আবার আঁটি বাঁধা পাটগাছ নিয়ে ছুটে চলছেন পাশের খাল, ডোবা কিংবা জলাশয়ের দিকে তা' ধৌত করার জন্য । ডোবার পানিতে সারি-সারি পাটের আঁটি ভিজিয়ে রাখার দৃশ্য যেনো এখন অহরহ চোখে পড়ছে। চারিদিকে যেনো এখন পাট পঁচা স্বস্তির গন্ধ। সব মিলিয়ে মাদারীপুরে এখন সোনালি আঁশ পাট ঘরে তোলার কর্মময় ব্যস্ততার উৎসবমুখর পরিবেশ। তারপরেও যেনো হাসি ফুটছে না মাদারীপুরে পাট চাষীদের। গতবারে জেলায় প্রতিমন পাট ৪০০০ টাকা থেকে ৪২০০ টাকায় বিক্রি হলেও এ বছরে তা নেমে গেছে ৩৭০০ টাকা থেকে ৩৮০০ টাকায়। গতবারের চেয়ে এবার উৎপাদন বেশী করেছেন কৃষকেরা। বাজারে পাটের আমদানি বেশী হওয়া দাম কমে যাবার কারণ বলে উল্লেখ করছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। উৎপাদন খরচের চেয়ে এবার পাট কম দামে বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা। তাই বাম্পার ফলন হলেও যেনো দুশ্চিন্তার ভাজ কৃষকের চোখেমুখে। জেলার শিবচর, কালকিনি, রাজৈর, ডাসার ও সদর উপজেলার মাঠগুলোতে এখন পাট কাটা, পরিবহন, পাট পচনক্রিয়া, পাটখড়ি আহরণ কাজ চলছে পুরোদমে। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পরিবারের পুরষ সদস্যদের পাশাপাশি নারীরাও দিনরাত কাজ করছেন পাট ঘরে তুলতে। ফলে মাদারীপুরের পুরো গ্রামীণ জনপদে তৈরি হয়েছে এক দারুণ কর্মচাঞ্চল্য। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে মাদারীপুরের ৫টি উপজেলায় ৩৬ হাজার ৯২৫ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে এবার আবাদ হয়েছে ৩৭ হাজার ৫৬ হেক্টর জমিতে এবং ফলনও হয়েছে বাম্পার। কিন্তু বাম্পার ফলনের পরও শেষ পর্যন্ত ভালো দাম পাবেন কিনা- তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন চাষীরা। মাদারীপুর সদর উপজেলার পাঁচখোলা ইউনিয়নের কৃষক আলমগীর বাদশা বলেন, 'কয়েক মাসের কষ্টের পর এখন পাট কাটার সময় এসেছে। জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, কীটনাশক ও সেচ দিতে অনেক টাকা খরচ হয়েছে, সঙ্গে বেড়েছে শ্রমিকের মজুরি। ফলন ভালো হলেও বাজারের পরিস্থিতি নিয়ে দুশ্চিন্তা থেকেই যাচ্ছে'। শিবচরের কাদিরপুর ইউনিয়নের আজমল গোমস্তা বলেন, 'এবার ফলন ভালো হলেও চাষের খরচ অনেক বেশি, পাট কাটা ও পাট পঁচানো বা জাগ দেয়ার জন্য আলাদা শ্রমিক লাগছে, বাজারে যদি পাটের ভালো দাম না পাওয়া যায়, তবে কোনো লাভই থাকবে না বরং লোকসান হতে পারে'। একই রকম অভিজ্ঞতার কথা জানালেন কালকিনির সাহেবরামপুর ইউনিয়নের কৃষক আনিছ সরদার ও হামিদ খান। তারা জানান, ভালো মানের আঁশ পেতে উপযুক্ত সময় ও পানির প্রয়োজন। তবে কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় পানি বেশি, আবার কোথাও পানির অভাব থাকায় কিছুটা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। পানির অভাবে পাট নষ্ট হওয়া ও আঁশের মান খারাপ হওয়ার ভয়ে অনেকে নিচু জমির পাট দ্রুত কেটে ফেলছেন।কৃষকদের সবচেয়ে বড় দাবি, তারা যেন বাজারে পাটের ন্যায্যমূল্য পান এবং মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়া- দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধ হয়। রাজৈরের এক পাটচাষি বলেন, 'কষ্টের ফসল বিক্রি করে আমরা যেন সঠিক দাম পাই, সেটাই মূল চাওয়া এবং সরাসরি বাজারে তা' বিক্রির সুযোগ পেলে আমরা বেশি লাভবান হবো। কৃষি বিভাগের মতে চলতি মৌসুমে অতিরিক্ত জমিতে পাটের আবাদ হওয়ায় এবার ভালো উৎপাদনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কৃষকের ঘাম আর শ্রমে ধীরে ধীরে ঘরে উঠছে সোনালি আঁশ। এখন বাজারে সঠিক মূল্য পেলে চাষিদের এই কঠোর পরিশ্রম সার্থক হবে বলে আশা প্রকাশ করছেন মাদারীপুরের সাধারণ কৃষকেরা।