বিনোদন ডেস্কঃ
মুক্তির পর থেকেই দর্শকদের নজর কেড়েছে অ্যানিমেশন সিনেমা ‘সোয়াপড’। গত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া ছবিটি টানা ১০ সপ্তাহ প্ল্যাটফর্মটির গ্লোবাল টপ চার্টে শীর্ষস্থান ধরে রাখে। ইতোমধ্যে সিনেমাটির ভিউ ছাড়িয়েছে ১৪ কোটি, যা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে একটি অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের জন্য বড় অর্জন।
‘ট্যাঙ্গলড’-এর সহপরিচালক নাথান গ্রেনোর পরিচালনায় নির্মিত এই ছবিটি স্কাইড্যান্স অ্যানিমেশনের জন্যও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। স্টুডিওটির আগের দুটি সিনেমা ‘লাক’ ও ‘স্পেলবাউন্ড’ প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলেও ‘সোয়াপড’ সেই আস্থার জায়গা অনেকটাই ফিরিয়ে এনেছে।
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র অলি, পুকু প্রজাতির এক কৌতূহলী প্রাণী। ছোটবেলা থেকেই সে শুনে এসেছে, অন্য প্রজাতির প্রাণীরা তাদের শত্রু। কিন্তু সেই ধারণা নিয়ে তার মনে প্রশ্ন থেকেই যায়। একদিন ফসল উৎসবের সময় জাভান প্রজাতির ছোট্ট পাখি আইভির সঙ্গে পরিচয় হয় অলির। ক্ষুধার্ত আইভিকে সাহায্য করতে গিয়ে সে দেখিয়ে দেয় পুকুদের গোপন খাদ্যভান্ডার। সেই এক সিদ্ধান্তই বিপদ ডেকে আনে পুরো পুকু সম্প্রদায়ের জন্য।
নিজের ভুলের দায় কাঁধে নিয়ে অলি যখন সবকিছু ঠিক করার চেষ্টা করে, তখন এক রহস্যময় জাদুকরি ফলের প্রভাবে সে নিজেই জাভানে রূপান্তরিত হয়। এরপর শুরু হয় এমন এক যাত্রা, যেখানে শত্রুর চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখার সুযোগ পায় দুই পক্ষই। ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে বহু বছরের ভুল ধারণা ও অবিশ্বাসের ইতিহাস।
গল্পের মূল কাঠামো খুব নতুন নয়। শরীর অদলবদল, ভুল বোঝাবুঝি, শত্রু থেকে বন্ধুত্ব, এ ধরনের উপাদান আগেও বহু চলচ্চিত্রে দেখা গেছে। তবে ‘সোয়াপড’-এর শক্তি গল্পের চমকের চেয়ে তার নির্মিত কল্পনার জগতে।
‘ভ্যালি’ নামের এই কল্পলোক ছবিটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। সমুদ্র-ভোঁদড়সদৃশ পুকু, প্যাঁচা ও টিয়াপাখির বৈশিষ্ট্যের জাভান, গাছের মতো বিশাল ডজো কিংবা জ্বলন্ত ফায়ার উলফ, প্রতিটি প্রাণীর নকশা ও পরিবেশ নির্মাণে নির্মাতাদের যত্ন স্পষ্ট। ফলে ‘ভ্যালি’ কেবল গল্পের পটভূমি নয়, নিজেই ছবির একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে ডজোদের নকশা দর্শকদের মুগ্ধ করে। বিশাল দেহজুড়ে গাছপালা, লতাপাতা আর অসংখ্য প্রাণীর বসবাস—এই কল্পনা প্রকৃতি ও জীবনের পারস্পরিক নির্ভরশীলতার প্রতীক হিসেবে কাজ করে। এসব দৃশ্য অনেক দর্শকের কাছে জাপানি অ্যানিমেশনের নান্দনিকতার স্মৃতি ফিরিয়ে আনে।
ছবিটির আরেকটি বড় শক্তি এর বার্তা। শরীর অদলবদলকে শুধু হাস্যরসের উপাদান হিসেবে নয়, অন্যের অবস্থান থেকে পৃথিবীকে বোঝার একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন নির্মাতা। সহমর্মিতা, সহাবস্থান ও পারস্পরিক বিশ্বাসের মতো বিষয়গুলো শিশুতোষ অ্যাডভেঞ্চারের মধ্যেই সহজভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
ভয়েস কাস্টও প্রশংসার দাবিদার। অলির কণ্ঠে মাইকেল বি. জর্ডান এবং আইভির চরিত্রে জুনো টেম্পল প্রাণবন্ত অভিনয় করেছেন। বুগল চরিত্রে ট্রেসি মর্গানের কৌতুকপূর্ণ উপস্থিতি গল্পের আবেগঘন মুহূর্তগুলোকে ভারসাম্য দিয়েছে। পাশাপাশি সিদ্ধার্থ খোসলার আবহসংগীত ছবিটির রূপকথার আবহকে আরও গভীর করেছে।
তবে ছবিটির কিছু দুর্বলতাও রয়েছে। প্রথমার্ধে ধীরগতিতে গল্প এগোলেও দ্বিতীয়ার্ধে ঘটনাপ্রবাহ অনেক দ্রুত এগিয়ে যায়। ফলে অলির অপরাধবোধ, আইভির পরিবর্তন কিংবা ফায়ার উলফকে ঘিরে সংঘাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার সুযোগ ছিল।
সব মিলিয়ে ‘সোয়াপড’ গল্প বলার নতুন ধারা তৈরি না করলেও পরিচিত একটি কাহিনিকে অসাধারণ ভিজ্যুয়াল, হৃদয়ছোঁয়া আবেগ এবং সমৃদ্ধ কল্পনার জগতের মাধ্যমে স্মরণীয় করে তুলেছে। শিশুদের পাশাপাশি বড়দের জন্যও এটি হতে পারে উপভোগ্য একটি অ্যানিমেশন অভিজ্ঞতা।