বিশেষ প্রতিনিধিঃ
দেশে জঙ্গি তৎপরতা আছে কি নেই-এই চিরন্তন বিতর্কে এবার বিএনপি সরকারের দুই প্রভাবশালী ব্যক্তির বক্তব্যে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী ভাষ্য ফুটে উঠেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ যখন সগৌরবে দেশে কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই বলে দাবি করছেন, ঠিক তখনই প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলছেন ভিন্ন কথা। তার মতে, দেশে জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব ছিল এবং এখনো আছে। সরকারের এই দুই শীর্ষ ব্যক্তির এমন পরস্পরবিরোধী অবস্থান সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে ধোঁয়াশা ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে কোস্ট গার্ডের এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্টভাবেই জঙ্গি তৎপরতার অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে বর্তমানে উগ্রবাদী বা চরমপন্থি কিছু রাজনৈতিক শক্তি থাকলেও ‘জঙ্গি’ শব্দটি বর্তমান কালচারে আর প্রাসঙ্গিক নয়। মন্ত্রীর ভাষ্যমতে, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে এই শব্দটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করত। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার সতর্কবার্তাকে রুটিন কাজ হিসেবে দেখলেও তিনি দেশে কোনো সুসংগঠিত জঙ্গি নেটওয়ার্কের অস্তিত্ব মানতে নারাজ।
অন্যদিকে সচিবালয়ে ব্রিফিংকালে তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বাস্তুববাদী অবস্থান নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, দেশে জঙ্গি নেই বলাটা হবে একটি চরমপন্থী বা ভুল অবস্থান। তিনি মনে করেন, আওয়ামী লীগ যেমন ক্ষমতায় থাকার জন্য জঙ্গিবাদকে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করত, তেমনি বর্তমান সময়ে এসে এর অস্তিত্ব পুরোপুরি অস্বীকার করাও বিপজ্জনক। উপদেষ্টার যুক্তি হচ্ছে, কোনো সমস্যাকে যদি স্বীকারই না করা হয়, তবে তার সমাধান বা চিকিৎসা সম্ভব নয়। ৫ আগস্টের পর কারাগার থেকে অনেক দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি ও জঙ্গির বেরিয়ে যাওয়ার সত্যতাও তার বক্তব্যে পরোক্ষভাবে উঠে এসেছে।
গত বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এক বিশেষ সতর্কবার্তা জারি করা হয়। সেখানে জানানো হয়েছিল যে, নিষিদ্ধঘোষিত একটি উগ্রবাদী সংগঠন জাতীয় সংসদ ভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে। এরপরই বিমানবন্দরসহ দেশজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। এই সতর্কবার্তা জারির পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘জঙ্গি নেই’ বলা এবং উপদেষ্টার ‘জঙ্গি আছে’ স্বীকারোক্তি-দুইয়ে মিলে এক বিচিত্র পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। এতে করে মাঠ পর্যায়ের গোয়েন্দা নজরদারি এবং প্রশাসনিক তৎপরতায় কোনো সমন্বয়হীনতা তৈরি হবে কি না, সেই প্রশ্নও তুলছেন বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের বক্তব্যে যখন অমিল থাকে, তখন অপরাধী বা উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো সুযোগ নিতে চায়। একদিকে জনমনে ভীতি দূর করার চেষ্টা, অন্যদিকে বাস্তব ঝুঁকি মোকাবিলা-এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ৫ আগস্ট পরবর্তী অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে পলাতক জঙ্গিদের সংগঠিত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদান এবং বয়ানের একমুখিতা না থাকলে জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
জঙ্গিবাদকে রাজনৈতিক ইস্যু না বানিয়ে একে একটি জাতীয় নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে দেখাই এখন সময়ের দাবি। তথ্য উপদেষ্টার ভাষ্য অনুযায়ী, এটাকে শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে হলে এর অস্তিত্ব স্বীকার করে কার্যকরী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকার যদি এই দ্বিমুখী অবস্থান কাটিয়ে উঠতে না পারে, তবে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়াটি হোঁচট খেতে পারে। শেষ পর্যন্ত বর্তমান সরকার কোন পথে এই সমস্যার চিকিৎসা করবে, তা দেখার বিষয়। তবে দেশবাসী আশা করে, গোয়েন্দা তথ্যের সঠিক বিশ্লেষণ এবং রাষ্ট্রীয় ভাষ্যের স্বচ্ছতা বজায় রেখে সরকার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।
মোঃ কামরুজ্জামান মিলন
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক তুহিন প্রিন্টিং প্রেস ফকিরাপুল ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
ই-মেইল: 𝐝𝐚𝐢𝐧𝐢𝐤𝐚𝐥𝐨𝐤𝐢𝐭𝐨𝐧𝐞𝐰𝐬@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦
ই-পেপার: 𝐞𝐩𝐚𝐩𝐞𝐫.𝐝𝐚𝐢𝐧𝐢𝐤𝐚𝐥𝐨𝐤𝐢𝐭𝐨𝐧𝐞𝐰𝐬.𝐜𝐨𝐦
ওয়েবসাইট: 𝐰𝐰𝐰.𝐝𝐚𝐢𝐧𝐢𝐤𝐚𝐥𝐨𝐤𝐢𝐭𝐨𝐧𝐞𝐰𝐬.𝐜𝐨𝐦
মোবাইল: ০১৯২৭-৩০২৮৫২/০১৭৫০-৬৬৭৬৫৪
আলোকিত মাল্টিমিডিয়া লিমিটেড