রাজশাহী ব্যুরো:
দেশের গুরুত্বপূর্ণ সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) গাড়ির নিবন্ধন, ফিটনেস সনদ, ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ মোটরযান সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা প্রদান করে থাকে। প্রতিদিন এসব সেবা নিতে হাজারো মানুষ বিআরটিএ কার্যালয়ে ভিড় জমালেও দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন অফিসকে ঘিরে দালালচক্র, ঘুষ বাণিজ্য ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসছে। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে রাজশাহী বিআরটিএ কার্যালয়কে ঘিরে এমন অভিযোগ আরও বিস্তৃত, সংগঠিত এবং প্রভাবশালী রূপে সামনে এসেছে।
স্থানীয় সূত্র, ভুক্তভোগী সেবাগ্রহীতা এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজশাহী বিআরটিএ অফিসকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অফিসের ভেতরের কিছু কর্মকর্তা–কর্মচারীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় এই চক্র পরিচালিত হচ্ছে এবং সরকারি নির্ধারিত ফি’র বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে দ্রুত সেবা দেওয়ার নামে গড়ে উঠেছে একটি অস্বচ্ছ অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বিআরটিএ কার্যালয়ে প্রবেশের আগেই অনেক সেবাগ্রহীতা দালালদের মুখোমুখি হচ্ছেন। লাইসেন্স, ফিটনেস, নিবন্ধন কিংবা মালিকানা হস্তান্তরের মতো সেবা দ্রুত করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এই অর্থের একটি অংশ নিয়মিতভাবে অফিসের ভেতরের একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আতাউর রহমান এবং সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক বিজন কুমার পালকে ঘিরেই এই সিন্ডিকেটের কার্যক্রম আবর্তিত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ফাইল দ্রুত নথিভুক্ত করা, সিরিয়াল এগিয়ে দেওয়া, পরীক্ষায় সুবিধা পাইয়ে দেওয়া এবং বিভিন্ন সেবা সহজীকরণের নামে দালালদের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের একটি প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি গড়ে উঠেছে।
স্থানীয়ভাবে বিজন কুমার পালকে অনেকেই অনানুষ্ঠানিকভাবে “অবৈধ ক্যাশিয়ার” হিসেবে উল্লেখ করেন। অভিযোগ রয়েছে, দালালদের মাধ্যমে আদায়কৃত অর্থের বড় একটি অংশ তার মাধ্যমেই লেনদেন হয় এবং অফিসের ভেতরে ফাইল প্রক্রিয়াকরণে তার একটি প্রভাবশালী ভূমিকা রয়েছে।
এদিকে নতুন করে গুরুতর একটি অভিযোগ সামনে এসেছে—বিজন কুমার পাল বিভিন্ন নতুন ও পুরাতন মোটরসাইকেল শো-রুম মালিকদের সঙ্গে যোগসাজশ করে অবৈধভাবে লাইসেন্স ও মালিকানা পরিবর্তনের একটি পৃথক সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, নির্ধারিত প্রক্রিয়া এড়িয়ে দ্রুত মালিকানা হস্তান্তর, কাগজপত্র ‘ম্যানেজ’ এবং রেকর্ড পরিবর্তনের নামে বিপুল অংকের অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এতে করে বৈধ প্রক্রিয়া উপেক্ষিত হচ্ছে এবং সিস্টেমের স্বচ্ছতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অন্যদিকে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আতাউর রহমান দীর্ঘদিন ধরে একই কার্যালয়ে কর্মরত থাকায় স্থানীয় পর্যায়ে তার একটি শক্তিশালী প্রভাব বলয় তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর দাবি, দীর্ঘদিনের অবস্থান ও স্থানীয় যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি প্রশাসনিক বিভিন্ন কার্যক্রমে অনানুষ্ঠানিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন।
অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, পরীক্ষার আগের দিন চুক্তিভিত্তিক কিছু পরীক্ষার্থীর রোল নম্বর সংগ্রহের কাজেও আতাউর রহমান জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, নির্দিষ্ট কিছু প্রার্থীর তথ্য আগেভাগে সংগ্রহ করে তাদের পরীক্ষায় সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার একটি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এই পুরো সিন্ডিকেটের পেছনে রয়েছেন রাজশাহী বিভাগের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) পার্কন চৌধুরী। তাকে এই চক্রের মূল সমন্বয়কারী হিসেবে উল্লেখ করে অভিযোগ উঠেছে যে, তার প্রশাসনিক প্রভাবের কারণেই দালালচক্র দীর্ঘদিন ধরে নির্বিঘ্নে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—রাজশাহী বিআরটিএ সার্কেল দপ্তর ও বিভাগীয় কার্যালয় একই স্থানে অবস্থিত হওয়ায় প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ। এতে করে বিভাগীয় কার্যালয়ের কিছু কর্মকর্তা–কর্মচারী সার্কেল অফিসের কার্যক্রমে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করতে পারছেন এবং যোগসাজশের মাধ্যমে অনিয়ম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, পার্কন চৌধুরী বর্তমানে রাজশাহী বিভাগের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে রংপুর বিভাগেরও দায়িত্ব পালন করছেন। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দুই বিভাগের অধীনস্থ বিভিন্ন জেলার সার্কেল অফিসগুলো থেকে পরীক্ষার দিনগুলোকে কেন্দ্র করে নিয়মিতভাবে একটি নির্দিষ্ট অংকের অর্থ উত্তোলন করা হয়।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, বিভিন্ন সার্কেলের মোটরযান পরিদর্শক ও সহকারী পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এই অর্থ সংগ্রহ করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, এই অর্থ নির্ধারিতভাবে উপরে পৌঁছাতে না পারলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়।
অভিযোগ উঠেছে, নির্ধারিত অর্থ না দিলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলির ভয় দেখানো হয় বা প্রশাসনিকভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটেছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন অভ্যন্তরীণ সূত্র।
এই পরিস্থিতিতে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের আওতাধীন একাধিক সার্কেলের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলেও জানা গেছে। তবে ভয়ে অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, পার্কন চৌধুরী ২০২৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত বিআরটিএর ঢাকা মেট্রো–৪ সার্কেলের উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় প্রশিক্ষণ খাতে প্রায় আড়াই থেকে তিন কোটি টাকার বরাদ্দ ছিল বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানো, ডুপ্লিকেট ভাউচার ব্যবহার এবং বাস্তবে প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিল উত্তোলনের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এসব অনিয়ম সামনে আসার আশঙ্কা তৈরি হলে প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে বিষয়গুলো ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এমনকি অডিট রিপোর্টে উঠে আসা কিছু অনিয়মও বিভিন্নভাবে ‘ম্যানেজ’ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজশাহী বিআরটিএ কার্যালয়কে ঘিরে বিল–ভাউচার সংক্রান্ত একটি পৃথক সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগও পাওয়া গেছে। অফিস মেরামত, ভাড়া, স্টেশনারি ও অন্যান্য খাতের নামে ভুয়া কিংবা অতিরিক্ত ভাউচার তৈরি করে সরকারি অর্থ উত্তোলনের ঘটনাও ঘটছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে।
প্রশাসনিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে একটি বদলি আদেশ বাতিলের ঘটনা। গত ৭ মার্চ জারি করা এক অফিস আদেশে পার্কন চৌধুরীকে বিআরটিএ সদর দপ্তরে বদলি করা হয়। কিন্তু মাত্র দুই দিনের মাথায় ৯ মার্চ সেই আদেশ বাতিল করা হয়। ফলে তিনি আগের কর্মস্থলেই বহাল থাকেন।
অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর দাবি, উপরমহলের প্রভাব খাটিয়েই এই বদলি স্থগিত করা হয়েছে, যা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
একাধিক সেবাগ্রহীতা জানিয়েছেন, সরকারি নিয়মে সেবা নিতে গেলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, কিন্তু দালালের মাধ্যমে গেলে দ্রুত কাজ সম্পন্ন হয়—যদিও এর জন্য অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। অনেকেই বাধ্য হয়ে এই অনিয়মের আশ্রয় নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।
সচেতন মহল মনে করছে, বিআরটিএর মতো গুরুত্বপূর্ণ জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অভিযোগ কেবল সেবার মানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, বরং সাধারণ মানুষের আস্থাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাই বিষয়টি দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি বলে তারা মত দিয়েছেন।
রাজশাহী বিভাগের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) পার্কন চৌধুরী বলেন, আমার বিষয়ে সব অভিযোগ মিথ্যা ও ভিক্তিহীন আমার বদলীর হয়েছিল এটি সত্য কিন্তু বদলীর আদেশ স্থগিত হওয়ার পিছনে আমার কোন হাত নেই এবং আমি কাউকে বদলি করার ক্ষমতাও রাখিনা।
এবিষয়ে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আতাউর রহমান এর সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও কোন বক্তব্য পাওয়া যাইনি।
এবিষয়ে সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক বিজন কুমার পাল বলেন, “দালালদের সাথে আমার কোন সম্পৃক্তকতা নেই যদি কোন অভিযোগ থাকে তাহলে নিয়ে আসেন।
মোঃ কামরুজ্জামান মিলন
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক তুহিন প্রিন্টিং প্রেস ফকিরাপুল ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
ই-মেইল: 𝐝𝐚𝐢𝐧𝐢𝐤𝐚𝐥𝐨𝐤𝐢𝐭𝐨𝐧𝐞𝐰𝐬@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦
ই-পেপার: 𝐞𝐩𝐚𝐩𝐞𝐫.𝐝𝐚𝐢𝐧𝐢𝐤𝐚𝐥𝐨𝐤𝐢𝐭𝐨𝐧𝐞𝐰𝐬.𝐜𝐨𝐦
ওয়েবসাইট: 𝐰𝐰𝐰.𝐝𝐚𝐢𝐧𝐢𝐤𝐚𝐥𝐨𝐤𝐢𝐭𝐨𝐧𝐞𝐰𝐬.𝐜𝐨𝐦
মোবাইল: ০১৯২৭-৩০২৮৫২/০১৭৫০-৬৬৭৬৫৪
আলোকিত মাল্টিমিডিয়া লিমিটেড