
ক্রাইম রিপোর্টারঃ
বগুড়া সদরের নুনগোলা ইউনিয়নের রজাকপুর গ্রামে অবস্থিত একটি প্রাচীন টিলা স্থানীয়ভাবে পরিচিত “চাঁদ সওদাগরের ভিটা” নামে। লোককথা, মঙ্গলকাব্য এবং প্রাচীন বসতির সম্ভাব্য নিদর্শন—সব মিলিয়ে স্থানটি দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসীর কাছে ঐতিহ্যবাহী স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সমাদৃত হলেও এখনো তা আনুষ্ঠানিক গবেষণা ও সংরক্ষণের অপেক্ষায় রয়েছে।
বাংলা মধ্যযুগীয় সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় ধারা মঙ্গলকাব্য। বিশেষ করে মনসামঙ্গল কাব্যে চাঁদ সওদাগর এক কিংবদন্তি বণিক চরিত্র হিসেবে পরিচিত। কাহিনি অনুযায়ী, তিনি দেবী মনসার পূজা মানতে অস্বীকৃতি জানান, যার ফলশ্রুতিতে তাঁকে নানাবিধ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়। এই কাহিনি মধ্যযুগীয় বাংলার সামাজিক-ধর্মীয় মনস্তত্ত্ব ও বিশ্বাসব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত।
রজাকপুর গ্রামের এই ভিটাটি লোকমুখে চাঁদ সওদাগরের আবাস বা ব্যবসাকেন্দ্রের স্মৃতিবাহী স্থান হিসেবে পরিচিত। যদিও সরাসরি প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ এখনো সুস্পষ্ট নয়, তবুও দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত জনশ্রুতি স্থানটিকে একটি ঐতিহাসিক আবহ প্রদান করেছে।
স্থানটি উঁচু টিলা আকৃতির, যা সাধারণ ভিটা থেকে আলাদা করে চিহ্নিত করা যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মাটির নিচে পুরনো ইট, দেয়াল কিংবা স্থাপনার চিহ্ন পাওয়া গেছে। আশেপাশে প্রাচীন ইটের গাঁথুনি ও মাটির স্তরবিন্যাসও দৃশ্যমান, যা ইঙ্গিত দেয় এটি কোনো একসময় সুসংগঠিত বসতি বা স্থাপনা হতে পারে।
বড় আকারের প্রাচীন বৃক্ষ ও উঁচু ভিটার গঠন স্থানটির প্রাচীনত্বের ধারণাকে আরও জোরদার করে। যদিও প্রত্নতাত্ত্বিক খনন বা বৈজ্ঞানিক জরিপ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হয়নি, তবু বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ গবেষণা হলে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তথ্য উদঘাটিত হতে পারে।
ঐতিহাসিকভাবে বগুড়া অঞ্চল প্রাচীন পুন্ড্রবর্ধন জনপদের অংশ ছিল। এর অদূরেই অবস্থিত দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থান মহাস্থানগড়, যা প্রাচীন পুন্ড্রনগরের ধ্বংসাবশেষ হিসেবে স্বীকৃত।
এই প্রেক্ষাপটে ধারণা করা হয়, চাঁদ সওদাগরের ভিটা এলাকাটিও একই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অংশ হতে পারে। যদি প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে এ স্থানের সময়কাল ও কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করা যায়, তবে তা পুন্ড্রবর্ধন অঞ্চলের ইতিহাসচর্চায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
বর্তমানে স্থানটিতে পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা বা তথ্যফলক নেই বলে স্থানীয়রা জানান। ফলে ঐতিহ্যবাহী এই স্থানের গুরুত্ব সম্পর্কে বহিরাগতদের অবগতির সুযোগ সীমিত।
ইতিহাসবিদ ও সচেতন নাগরিকদের মতে, সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ, গবেষণা ও সংরক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণ করা হলে এটি বগুড়ার পর্যটন মানচিত্রে একটি নতুন সংযোজন হতে পারে। পাশাপাশি, স্থানীয় ঐতিহ্য রক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।