রাজশাহী ব্যুরো:
নিয়ন্ত্রিত ও ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক এসিডের ব্যবহার ও বাণিজ্য ঘিরে রাজশাহীতে একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে—লাইসেন্স ছাড়া এসিড লেনদেন, লাইসেন্সের শর্ত ভেঙে ভিন্ন স্থানে মজুদ, চালানবিহীন সরবরাহ এবং সেই এসিড ব্যবহার করে অনুমোদনহীন কেমিক্যাল পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করার একটি সমন্বিত চক্র সক্রিয় রয়েছে। এতে প্রশাসনিক নজরদারি ও বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০২ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী লাইসেন্স ছাড়া এসিড আমদানি, উৎপাদন, মজুদ, পরিবহন, বিক্রয় বা ব্যবহার করা দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রতিটি লেনদেনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত রেজিস্টার সংরক্ষণ, চালান প্রদান এবং নির্ধারিত স্থানে সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। শর্ত ভঙ্গ করলে লাইসেন্স বাতিলসহ ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
সপুরা বিসিক এলাকায় ‘মেসার্স নূর ট্রেডিং’-এর স্বত্বাধিকারী আনোয়ারুল আলম ওরফে সেন্টু খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে—তার লাইসেন্সে নির্ধারিত ঠিকানা পবা রাইস মিল পাড়া বিসিক উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে তিনি সপুরা বিসিক এলাকায় মিতা প্লটের ভেতরে বিপুল পরিমাণ এসিড মজুদ রেখে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
এছাড়াও অনুমোদিত সীমার অতিরিক্ত ব্যবহার ও বিক্রয়, সাধারণ ভ্যানযোগে নিরাপত্তা প্রটোকল ছাড়া পরিবহন এবং ক্রয়-বিক্রয়ের নির্ধারিত রেজিস্টার সংরক্ষণে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, সেন্টু খানের প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো বৈধ চালান ছাড়া এসিড সংগ্রহ করে হুমায়ুন নামের এক ব্যক্তি ‘ডাম ফক্স’ নামে একটি কেমিক্যাল পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব লেনদেন প্রশাসনের নজরদারি ফাঁককে কাজে লাগিয়ে করা হচ্ছে।
অভিযুক্তরা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তারা দাবি করেছেন, সব ধরনের কার্যক্রম বৈধ প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হচ্ছে।
সেন্টু খানের প্রতিষ্ঠান থেকে দীর্ঘদিন ধরে কোন চালান ছাড়াই ‘সেইফ ড্যাম্প ওয়াশ’ উৎপাদনে এসিড ব্যবহার করে বোয়ালিয়া থানাধীন বিসিক শিল্পনগরীর ডি-৩৪৭ নম্বর প্লটে অবস্থিত ‘পিপুল কনজুমার প্রোডাক্টস্’ নামের প্রতিষ্ঠানে এই উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন পবা থানাধীন মৃত গোরজার রহমানের ছেলে মো. হুমায়ুন কবীর। তবে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন প্যাটেন্ট ও ডিজাইন কোনো অনুমোদনের ছাড়পত্র কিংবা নিয়ন্ত্রিত কেমিক্যাল ব্যবহারের বৈধ অনুমতির তথ্য দেখাতে পারেননি হুমায়ুন কবীর।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন, নিয়ন্ত্রিত কেমিক্যাল ব্যবহারের ছাড়পত্র এবং প্যাটেন্ট সংক্রান্ত বৈধ কাগজপত্র প্রদর্শনে অস্পষ্টতা রয়েছে। পণ্যের মোড়কে ব্যাচ নম্বর ও উৎপাদনের তারিখ থাকলেও কাঁচামালের উৎস, বিশেষ করে এসিড সংগ্রহের বৈধতা স্পষ্ট নয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নগরীর বোসপাড়া এলাকার ‘মেসার্স আনোয়ার কেমিক্যাল’-এর বিরুদ্ধেও লাইসেন্স ছাড়া এসিড ব্যবহার ও ‘ড্যামফিক্স’ নামের কেমিক্যাল পণ্য উৎপাদন ও বিক্রয়ের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ উঠেছে, পণ্যের মোড়কে “আনোয়ার কেমিক্যাল, বোসপাড়া” উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে সপুরা বিসিক এলাকায় গোপনীয়ভাবে অবৈধ প্রোডাক্ট উৎপাদন করে আসছেন আনোয়ার। এতে অনুমোদনহীন উৎপাদন এবং নিয়ন্ত্রিত কেমিক্যাল ব্যবহারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বৈধ ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন, তারা বৈধ লাইসেন্স নিয়ে নিয়মিত নবায়ন করে ব্যবসা পরিচালনা করলেও আনোয়ারের মত প্রতারক চক্রগুলো লাইসেন্সবিহীনভাবে অবাধে উৎপাদন ও বিক্রয় করছে। এতে বাজারে অসংগতিপূর্ণ প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কিছু উৎপাদনকেন্দ্রের আশপাশে তীব্র কেমিক্যালের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সালফিউরিক এসিডের মতো নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক অনিয়ন্ত্রিতভাবে সংরক্ষণ বা পরিবহন করা হলে তা অগ্নিকাণ্ড, বিস্ফোরণ এবং পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অভিযুক্তরা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তারা বৈধ প্রক্রিয়ায় কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তবে অভিযোগকারীদের বক্তব্য—লাইসেন্স, উৎপাদনস্থল ও কাঁচামালের উৎসের স্বচ্ছ যাচাই ছাড়া এসব দাবি গ্রহণযোগ্য নয়।
সব মিলিয়ে বিষয়টি একাধিক প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধ সমস্যা নয়; বরং এসিড নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকর বাস্তবায়ন ও প্রশাসনিক তদারকি নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, অবিলম্বে সমন্বিত তদন্ত, লাইসেন্স যাচাই, উৎপাদনস্থল পরিদর্শন এবং প্রয়োজনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হলেও প্রশ্ন থেকে যায়—এই কার্যক্রম কতদিন ধরে চলছিল, এবং কার নজরদারির ফাঁক ব্যবহার করে তা সম্ভব হয়েছে?
শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্যাটেন্ট ও ডিজাইন অনুমোদন বিষয়ে জানতে চাইলে হুমায়ুন কবীর বলেন, বর্তমানে সংশ্লিষ্ট অনুমোদন এখনো সম্পন্ন হয়নি। তবে তিনি দাবি করেন, প্রয়োজনীয় অনুমোদনের প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করবেন।
অন্যদিকে, এ বিষয়ে সেন্টু খানকে পুনরায় প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, পিপুল কনজুমার প্রোডাক্টস্-এর পরিচালক হুমায়ুন কবীর ইতোমধ্যে ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে এসব বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করা কতটা যুক্তিযুক্ত—সে প্রশ্নও তিনি তোলেন।
এ বিষয়ে মেসার্স আনোয়ার কেমিক্যালের কতৃপক্ষ আনোয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি আমার পার্টনার প্রতিষ্ঠান কনফিডেন্স কেমিক্যাল-এর সঙ্গে যৌথভাবে বৈধ প্রক্রিয়ায় সব কার্যক্রম পরিচালনা করছি। আমাদের কোনো অবৈধ কার্যক্রম নেই।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
মোঃ কামরুজ্জামান মিলন
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক তুহিন প্রিন্টিং প্রেস ফকিরাপুল ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
ই-মেইল: 𝐝𝐚𝐢𝐧𝐢𝐤𝐚𝐥𝐨𝐤𝐢𝐭𝐨𝐧𝐞𝐰𝐬@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦
ই-পেপার: 𝐞𝐩𝐚𝐩𝐞𝐫.𝐝𝐚𝐢𝐧𝐢𝐤𝐚𝐥𝐨𝐤𝐢𝐭𝐨𝐧𝐞𝐰𝐬.𝐜𝐨𝐦
ওয়েবসাইট: 𝐰𝐰𝐰.𝐝𝐚𝐢𝐧𝐢𝐤𝐚𝐥𝐨𝐤𝐢𝐭𝐨𝐧𝐞𝐰𝐬.𝐜𝐨𝐦
মোবাইল: ০১৯২৭-৩০২৮৫২/০১৭৫০-৬৬৭৬৫৪
আলোকিত মাল্টিমিডিয়া লিমিটেড