
মাহিদুল ইসলাম আউলিয়া (রংপুর ) প্রতিনিধিঃ
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার শাল্টি গোপালপুর বন বিভাগ ও ইকোপার্ক এলাকায় বন্যপ্রাণী শিকারের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। একদল সশস্ত্র শিকারি চক্রের অব্যাহত তান্ডবে বনের জীববৈচিত্র্য এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। প্রতিদিন প্রকাশ্যে তীর-ধনুক ও বল্লম নিয়ে বন বিড়াল, বেজি,গাছ ইদুর, কাঠবিড়ালি, পাখি,গুইসাপ এবং শিয়ালের মতো বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী নিধন করা হলেও প্রশাসনিক কোনো কঠোর পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন সকাল হতেই ১৫-২০ জনের একটি সংঘবদ্ধ সাঁওতাল শিকারি দল বনের গভীরে প্রবেশ করে। তাদের হাতে থাকে আদিম ধারালো অস্ত্র—তীর-ধনুক, বল্লম,গুলতি এবং মাটি খোঁড়ার সাবল। তারা ঝোপঝাড় ও গর্ত থেকে খুঁজে বের করে বন বিড়াল, শিয়াল ও বেজি সহ নানান বন্যপ্রাণী। এরপর অত্যন্ত অমানবিক কায়দায় পিটিয়ে বা আঘাত করে প্রাণীগুলোকে হত্যা করা হয়। শিকার শেষে মৃত প্রাণীগুলোকে বাঁশে ঝুলিয়ে বিজয়ের বেশে লোকালয় দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। পার্শ্ববর্তী পীরগঞ্জ উপজেলার চৈত্রকোল ইউনিয়নের চক কৃষ্ণ পুর আদিবাসী পাড়ার শিকারি দলের অন্যতম সদস্য রাম সাহান,কমল ও রাম মিনজী দম্ভোক্তী করে বলেন, “প্রতিটি বড় প্রাণী থেকে আমরা ৫ থেকে ২০ কেজি পর্যন্ত মাংস পাই। আমাদের পরিবারের আমিষের চাহিদা মেটাতে এই মাংস বেশ সহায়ক।” বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। মূলত সচেতনতার অভাব এবং সহজলভ্য প্রোটিনের উৎস হিসেবে তারা বনের প্রাণীদের টার্গেট করছে।পরিবেশবিদদের মতে, শিয়াল ও বন বিড়াল মূলত কৃষকের বন্ধু। এরা ফসলি জমির ইঁদুর ও অন্যান্য ক্ষতিকর পোকা খেয়ে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে। এভাবে অবাধে নিধন চলতে থাকলে এলাকায় ইঁদুরের উপদ্রব বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষিখাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি এই বনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও প্রাণবৈচিত্র্য চিরতরে হারিয়ে যাবে।
গোপালপুর বনবিটের রেঞ্জ বন কর্মকর্তা মোঃ ইকবাল হোসেন পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্বীকার করে বলেন, “গোপালপুর বনবিটের আওতাধীন এই অঞ্চলে চোরা শিকারীরা প্রায়ই চোরা ফাঁদ পাতে আমরা খবর পেয়ে সাথে সাথে অভিযানে নেমে পড়ি,আমাদের উপস্থিতি টের পেয়েই ওরা পালিয়ে যায়। বন্যপ্রাণী শিকার আইনত একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। শিকারীরা চাইলেই বন্যপ্রাণী শিকার করতে পারেনা। সংশ্লিষ্ট বিট বন কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া আছে তারা ওদের যেখানেই পাবে সেখান থেকে ধরে ভ্রমমাণ আদালতে মাধ্যমে জেল জরিমানার ব্যবস্থা করবে। আদিবাসী চোরা শিকারীদের ধরতে পারলে এক বিন্দুও ছাড় দেওয়া হবেনা। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ অনুযায়ী, বন্যপ্রাণী শিকার বা হত্যা করা জেল ও জরিমানাযোগ্য অপরাধ। এলাকাবাসীর অভিযোগ, নিয়মিত টহল না থাকায় শিকারিরা দিনের পর দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে অচিরেই শাল্টি গোপাল পুর বন বিট এলাকা প্রাণীশূন্য হয়ে পড়বে।
স্থানীয় বাসিন্দা সচেতন নাগরিক’রা দাবি করে বলেন, বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের উচিত দ্রুত যৌথ অভিযান পরিচালনা করা এবং শিকারি সম্প্রদায়কে আইনি কাঠামোর আওতায় এনে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা।