
বিশেষ প্রতিনিধিঃ
আমাকে মারধর করে টয়লেটে আটকে রাখা হতো। অনেক কান্না করলেও দরজা খুলত না। ক্ষুধার যন্ত্রণায় টয়লেটে টিস্যু খেতাম।’ কথাগুলো বলছিল রাজধানীর উত্তরায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. সাফিকুর রহমানের বাসায় বর্বরতার শিকার ১১ বছরের সেই গৃহকর্মী শিশু। বুধবার সন্ধ্যায় গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যুগান্তরের সঙ্গে কথা বলে সে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মেয়েটির শরীরের বিভিন্ন স্থানে পোড়া ক্ষত, গভীর জখম ও সেলাইয়ের চিহ্ন পাওয়া গেছে। যা দীর্ঘমেয়াদি নির্যাতনের ইঙ্গিত দেয়। তার শারীরিক অবস্থা এখনো বেশ উদ্বেগজনক। তবে সে অনেকটা স্বাভাবিকভাবে খাবার গ্রহণ করতে পারছে।
শিশুটির সঙ্গে তার দাদি ও বাবা রয়েছেন। তার বাবা জানান, ৮ মাস আগে সাফিকুর ও তার স্ত্রী বীথির বাসায় তাকে কাজে দিয়েছিলেন। প্রথম কয়েক মাস মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগে কোনো সমস্যা হয়নি। তবে ৩১ জানুয়ারি হঠাৎ করে বীথি ফোন করে মেয়েকে নিয়ে যেতে বলেন। তাকে আনতে বাসায় গেলে বীথি তার সঙ্গে কোনো কথা না বলে কৌশলে একটি সাদা কাগজে সই করিয়ে নেন। পরে যখন মেয়েকে তার হাতে তুলে দেওয়া হয়, তখন মেয়ের শারীরিক অবস্থা দেখে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এরপর গণমাধ্যমের সহযোগিতায় হাসপাতালে ভর্তি করান। ভুক্তভোগী শিশু জানায়, তাকে ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না এবং দিনের অধিকাংশ সময় বাথরুমে আটকে রাখা হতো। সেখানে ক্ষুধার যন্ত্রণায় বাধ্য হয়ে টিস্যু খেত। এছাড়া মারধরের পাশাপাশি গরম খুন্তি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাঁকা দেওয়া হতো।
এদিকে বুধবার সন্ধ্যায় গাজীপুরে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে নির্যাতিত শিশুটির খোঁজখবর নিয়েছেন বাণিজ্য এবং বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। শিশুটির চিকিৎসার সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিতে তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তাদের আশ্বস্ত করেন। এ সময় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাণিজ্য উপদেষ্টার কাছে টেলিফোন করে মেয়েটির খোঁজ নেন। তিনি তার চিকিৎসার ব্যয়সহ সব দায়িত্ব সরকার বহন করবে বলেও জানান। শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, একটি শিশুর প্রতি এমন নিষ্ঠুরতা কোনো সভ্য সমাজে মেনে নেওয়া যায় না। দুনিয়া ও আখেরাতে এর জন্য দায়ীদের শাস্তি পেতে হবে। তিনি এ সময় শিশুটির বাবাকে একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দেন।
বিমানের নতুন এমডি হুমায়রা : এদিকে শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতনের অভিযোগে সাফিকুর রহমানের নিয়োগ বাতিল করেছে সরকার। মঙ্গলবার বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের এক অফিস আদেশে তার নিয়োগ বাতিলের বিষয়টি জানানো হয়। একই আদেশে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. হুমায়রা সুলতানাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসাবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এমডি ও সিইও হিসাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই দিনে সাবেক এমডি ও তার স্ত্রী বীথি আক্তারের সম্পদের খোঁজে নেমেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ট্যাক্স গোয়েন্দা বিভাগ। তাদের পরিবারের অন্য সদস্যদের নামেও কোনো অঘোষিত বা গোপন সম্পদ রয়েছে কিনা, তা অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসাবে মঙ্গলবার সাফিকুর ও বীথির ব্যাংক হিসাব ও লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য জানতে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে চিঠি পাঠিয়েছে এনবিআরের ইনকাম ট্যাক্স ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ইউনিট।